নবজাতক শিশুর যত্ন

নবজাতক শিশুর যত্ন

সাধারণত কোনো শিশুকে জন্মের ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত নবজাতক বলা হয়। চিকিৎসকদের মতে, একটি শিশু তার জন্মের প্রথম ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত খুবই ঝুঁকিতে থাকে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় নবজাতক শিশুরা খুব সহজে একাধিক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা বলছে ২০১৮ সালে জন্মের প্রথম মাসেই সালে মারা গেছে প্রায় ২৫ লক্ষ শিশু। সংস্থাটির তথ্যমতে, সেবছর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭,০০০ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে।

নবজাতক শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, নবজাতক শিশুর যত্ন নিয়ে অসচেতনতা এবং কুসংস্কার শিশুমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, প্রসবে ত্রুটি এবং জন্মগতভাবে পাওয়া বিভিন্ন রোগও নবজাতক শিশু মৃত্যুর জন্য সমানভাবে দায়ী।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক উপায়ে নবজাতকের যত্ন রুখে দিতে পারে শিশু মৃত্যুর হার। এজন্য অবশ্য উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতেও নবজাতক শিশুর যত্ন নিয়ে কাজ করছে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের সেই কাজ আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন

 

নবজাতক শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা

জন্মের পর থেকেই নবজাতকের প্রয়োজনীয় যত্নের ব্যাপারে শতভাগ সচেতন থাকতে হয়। শিশুর জন্মের প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ ছাড়া বিকল্প কোনো খাবার খাওয়ানো উচিত নয়। শালদুধ গ্রহণের ফলে নবজাতকের দেহে রাতকানা এবং জন্ডিসের মতো ব্যাধির বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। শালদুধ শিশুর দেহে প্রাকৃতিক টিকা হিসেবে কাজ করে।

শিশু জন্মের পরপরই নরম সুতি কাপড় ব্যবহার করে পুরো দেহ পরিষ্কার করে শুষ্ক করতে হবে। পাশাপাশি নরম কাপড় ব্যবহার করে শিশুকে জড়িয়ে রাখা অত্যাবশ্যক। নবজাতকের জন্মের প্রথম ৩ দিনের মধ্যে কোনো অবস্থাতেই গোসল করানো উচিত নয়। অনেক সময়ই কান্না থামাতে কিংবা খেলার ছলে অনেকেই নবজাতককে কোলে নিয়ে দোল খাওয়াতে পছন্দ করেন। কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট কম্পন শিশুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। নবজাতককে কোলে নিয়ে চলাফেরা করার সময় মাথা যাতে বেঁকে না যায় সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।



অনেক অভিভাবকই নবজাতককে রাখার ঘরের দরজা, জানালা সারাক্ষণ বন্ধ রাখেন। এর ফলে বাইরের আলো বাতাসের অভাবে শিশুর দেহে নিউমোনিয়ার মতো ভয়াবহ রোগ দানা বাঁধতে পারে। এছাড়াও ঘরের তাপমাত্রাও যাতে শিশুর সহ্য সীমার বাইরে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

বাহির থেকে এসে সরাসরি নবজাতককে কোলে তুলে নেয়া উচিত নয়। কোলে নেয়ার আগে জীবাণুনাশক ব্যবহার করে হাত পরিষ্কার করা উচিত। এছাড়া শিশুদের নখ দ্রুত বাড়ে, নখের ভেতর ময়লা জমে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই নিয়মিত নবজাতকের নখ কাটা উচিত।

শিশু মলমূত্র ত্যাগ করার পর দ্রুত পরিষ্কার করে কাপড় বদলে দিতে হবে। নবজাতককে গোসল করানোর সময় অতিরিক্ত ঠান্ডা কিংবা গরম পানি ব্যবহার করা যাবে না। ৩৭-৪০ সপ্তাহ গর্ভে থাকা নবজাতকের উপযুক্ত ওজন ধরা হয় ২৫০০ গ্রাম। জন্মের পর নবজাতকের ওজন এর থেকে অত্যাধিক বেশি বা কম হলে অবশ্যই এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অনেক সময় বিভিন্ন রোগের কারণে বয়সের সাথে তাল মিলিয়ে নবজাতকের ওজনের বৃদ্ধি হয় না। তাই এরকম সমস্যার দেখা মিললে অবশ্যই শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন।

 

শীতে সময় নবজাতকের যত্ন

শিশুকে কয়েক স্তরের মোটা শীতের পোশাক পরিধান করাতে হবে। তবে অতিরিক্ত মোটা কাপড়ের পোশাকের জন্য শিশু যেন অস্বস্তিবোধ না করে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

শীতের সময় নবজাতককে সাথে নিয়ে কোথাও ভ্রমণ না করাই শ্রেয়।

শিশুকে গরম রাখার জন্য কখনোই চুলার কাছে কিংবা আগুনের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এর ফলে শিশুর শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হতে পারে।

খুব প্রয়োজন না হলে শিশুকে গোসল করানো থেকে বিরত রাখা উচিত।

শিশুকে সারাক্ষণ শুষ্ক রাখতে হবে।

নবজাতককে উষ্ণ রাখার জন্য ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার পদ্ধতি অর্থাৎ মায়ের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখতে হবে।

শিশুর দেহের তাপমাত্রার দিকে নজর রাখতে হবে। নবজাতকের দেহের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৫.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কম হলে হাইপোথার্মিয়া হতে পারে৷ আবার দেহের তাপমাত্রা ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৯.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের থেকে বেশি হলে নবজাতকের জ্বর হতে পারে। এই দুটি সমস্যার যেকোনো একটি হলেই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

 

গরমে নবজাতক শিশুর যত্ন

শিশুকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত নরম সুতি কাপড় ভিজিয়ে শিশুর গা মুছে দিতে হবে।

নবজাতকে পাতলা সুতি কাপড়ের পোশাক পরিধান করাতে হবে।

নবজাতকের শরীরের ঘাম নরম কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে। শিশুর অতিরিক্ত ঘাম শরীরের সাথে লেগে থাকলে তা থেকে ঠাণ্ডা লাগতে পারে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

নবজাতক শিশুর একমাত্র খাদ্যের উৎস মায়ের বুকের দুধ। তাই গরমের সময় মাকে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে শিশু প্রয়োজনীয় তরল পাবে।

গরমের সময় শিশুর দেহের বিভিন্ন জায়গায় ঘামাচি হতে পারে। ঘামাচি এড়ানোর জন্য নবজাতকের গোসলের পানি কুসুম গরম করে নিতে হবে।

প্রয়োজন ছাড়া শিশুকে ডায়াপার ব্যবহার না করানোই ভালো।

গরমের সময় নবজাতক শিশুর ঘুমাতে সমস্যা হয়। তাই ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

শিশুকে যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় রাখতে হবে।

 

নবজাতকের ত্বকের যত্ন

শিশুর জন্মের পর ত্বকের অবস্থা কিছুটা নাজুক থাকে। তবে নবজাতকের দেহের চামড়ায় ভারনিক্স (Vernix) নামের একপ্রকার তৈলাক্ত পদার্থ থাকে যা এন্টিবডির (Antibody) মতো কাজ করে। তাই শিশুর ত্বকের যত্নের জন্য হঠাৎ করেই কোনো পাউডার, ক্রিম, তেল ইত্যাদি ব্যবহার করানো যাবে না। এতে শিশুর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। এর ফলে নবজাতকের চামড়ায় ভারনিক্সের অভাবে শুষ্কতার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থায়ী দাগেরও সৃষ্টি হতে পারে।



নবজাতককে গোসল করানোর সময় সাবধান থাকতে হবে যাতে গোসলের কারণে নবজাতকের ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শিশুর ব্যবহৃত কাপড় থেকে বিভিন্ন চর্মরোগের সৃষ্টি হতে পারে। তাই নিয়মিত কাপড় পরিষ্কার করা জরুরি।

শিশুদের নখ বড় থাকার কারণে নখের আঁচড়ে দেহের বিভিন্ন জায়গার চামড়া ছিলে যেতে পারে। তাই নবজাতকের নখ বড় হলেই কেটে ছোট করে দিতে হবে। শিশুর ত্বকে অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রে যে ভুলগুলো করা যাবে না

নিজের যত্ন নেয়ার ক্ষমতা না থাকায় নবজাতক শিশুর যত্নে কোনো রকম হেলাফেলা করা উচিত নয়।

নবজাতক শিশুরা তাদের সমস্যার কথা বোঝাতে না পারলেও কান্নার মাধ্যমে তাদের সমস্যার কথা বোঝা সম্ভব।

নবজাতকের কান্নার কারণ বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বল প্রয়োগ করে নবজাতকের কান্না থামানোর চেষ্টা করা যাবে না। সাধারণত কোনো কারণে অস্বস্তিতে ভুগলে শিশুরা কান্না করে। শিশুকে কখনোই অস্বস্তিতে রাখা উচিত নয়। এতে তার মানসিক স্বাস্থ্যে স্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

নবজাতকের কাছাকাছি উচ্ শব্দে গান বাজনা বা অন্য কোনো শব্দ সৃষ্টি করা একেবারেই অনুচিত। এতে তার শ্রবণশক্তি লোপের পাশাপাশি মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।

শিশুর ঘরে অতিরিক্ত আলোর ক্ষতিকর বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার করা যাবে না। এতে নবজাতকের চোখ ও ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নবজাতক শিশুর কাছাকাছি ধূমপান পরিহার করতে হবে। এর কারণে শিশুর শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি হতে পারে।

শিশুর কোনো শারীরিক সমস্যা নজরে এলে যত দ্রুত সম্ভব কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যাবশ্যক।

Source: https://hetv.org/pdf/taking-care-of-a-baby-after-birth.pdf
https://kidshealth.org/en/parents/guide-parents.html
https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/newborns-reducing-mortality
https://www.parents.com/baby/health/babys-first-winter-a-survival-guide/

আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট




Categories