উচ্চ রক্তচাপ কি? উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও চিকিৎসা

 উচ্চ রক্তচাপ

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশন আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এক রোগ। এই রোগ সাধারণত কয়েক বছরের চেষ্টায় আমাদের দেহে বাসা বাঁধে। অধিকাংশ মানুষ এই রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন না। ফলে নীরবে আমাদের দেহে উচ্চ রক্তচাপের বিস্তার ঘটে।

আবার কারো কারো ক্ষেত্রে এই রোগের কোনো পূর্ব লক্ষণ প্রকাশ পায় না৷ কিন্তু এই রোগের ফলে রক্তনালী, চোখ, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এই রোগ সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

 

উচ্চ রক্তচাপ আসলে কী

আমাদের দেহের রক্তচাপ যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলে। রক্তনালীর মধ্য দিয়ে কী পরিমাণ রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে এবং হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করার সময় কতটুকু বাধার সম্মুখীন হচ্ছে সেটাই মূলত রক্তচাপ।

ধমনী যদি সরু হয়ে যায় তাহলে রক্ত চলাচলে বাধা প্রদান করে। পাশাপাশি ধমনী সরু হয়ে আসার ফলে রক্তনালীতে রক্তের চাপ বৃদ্ধি পায়৷ যদি দীর্ঘ সময় ধরে রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে তাহলে শরীরে আরো অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে হৃদরোগ হয়ে থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ যদি শুরুতেই ধরা পড়ে তাহলে খুব সহজেই একে মোকাবেলা করা সম্ভব। তাই আমাদের নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

যদি কোনো কারণে রক্তচাপ বেড়ে যায় তাহলে টানা এক থেকে দুই সপ্তাহ রক্তচাপ পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। যত তাড়াতাড়ি এই রোগ নির্ণয় করতে সক্ষম হবেন তত দ্রুত এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

 

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ

উচ্চ রক্তচাপ এক ধরনের নীরব ঘাতক। অনেকের ক্ষেত্রে এই রোগের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো এই রোগের সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক বছর কিংবা এক দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়। আবার এই রোগের এমন কিছু লক্ষণ রয়েছে যা অন্য রোগের সাথে সম্পর্কিত। ফলে সেগুলো থেকে আলাদাভাবে উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ চিহ্নিত করা যায় না। তবে এই রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করার আগে যেসব লক্ষণ পায়:

  • প্রচণ্ড মাথাব্যথা
  • নিঃশ্বাসের দুর্বলতা
  • নাক দিয়ে রক্তপড়া
  • অনিদ্রা
  • মাথা ঘোরা
  • বুকে ব্যথা হওয়া
  • দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন
  • মূত্রের সাথে রক্তপড়া



উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। হতে পারে এই লক্ষণ অন্য কোনো রোগের। তবে এক লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর আরেকটি লক্ষণের অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয়।

উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে মনে হয় তাহলে কিছুদিন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। পরিবারের অন্য সদস্যদের যদি রক্তচাপ থাকে, বিশেষ করে বাবা মায়ের থাকলে সন্তানেরও হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

 

উচ্চ রক্তচাপের প্রকারভেদ

উচ্চ রক্তচাপ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক. প্রধান উচ্চ রক্তচাপ এবং দুই. অপ্রধান উচ্চ রক্তচাপ। উভয় প্রকার উচ্চ রক্তচাপের ভিন্ন ভিন্ন কারণ রয়েছে।

প্রধান বা প্রাথমিক উচ্চ রক্তচাপ

এ উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় প্রয়োজনীয় হাইপারটেনশন। এই ধরনের উচ্চ রক্তচাপ উল্লেখযোগ্য কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের শরীরে সৃষ্টি হয়৷ বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের দেহেই এই ধরনের হাইপারটেনশন রয়েছে।

গবেষকরা এখনো রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং প্রাইমারি উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো কারণ আবিষ্কার করতে পারেননি। তবে এর পেছনে সম্ভাব্য বেশ কিছু কারণকে দায়ী করা হয়ে থাকে। তবে সেগুলো একেবারে সুনিশ্চিত প্রাইমারি হাইপারটেনশনের কারণ নয়।

  • জিন: অনেকের জিনগত কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয়। পিতামাতার কাছে থেকে পাওয়া জিন থেকে অনেকের এই রোগ হয়।
  • শারীরিক পরিবর্তন: আমাদের দেহের কোনো একটি অংশ যদি পরিবর্তিত হয়, তাহলে সেটা আমাদের দেহের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়। প্রাইমারি হাইপারটেনশনও এমন কোনো শারীরিক পরিবর্তনের ফলে হয়ে থাকতে পারে।
  • পরিবেশ: মাত্রাতিরিক্ত কাজ, অনিষ্টকর জীবনযাপন, শারীরিক ব্যায়ামের ঘাটতি এবং বাজে ডায়েটের কারণে হাইপারটেনশন হতে পারে। বিশেষ করে খারাপ জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে আমাদের দেহের ওজন বৃদ্ধি পায়। আর অতিরিক্ত ওজনের কারণে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।

সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন

সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন খুবই দ্রুত ঘটে এবং প্রাইমারি হাইপারটেনশনের চেয়ে তা খুবই বিপদজনক। বিভিন্ন কারণে সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন হতে পারে। উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে রয়েছে:

  • কিডনির সমস্যা
  • অবসট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া
  • হৃদরোগের সমস্যা
  • থাইরয়েডের সমস্যা
  • ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
  • মাদক গ্রহণ
  • মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান
  • মূত্রগ্রন্থির সমস্যা
  • এন্ডোক্রাইন টিউমার

 

উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় পদ্ধতি

উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় করা খুবই সহজ। রক্তচাপ পরীক্ষার মাধ্যমে অতি সহজেই এই রোগ নির্ণয় করা যায়। তবে একবার বা দুইবার রক্তচাপ মেপে রক্তচাপের সমস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

যদি স্বাভাবিকের চেয়ে রক্তচাপ বেশি হয় তাহলে টানা এক সপ্তাহ তা মেপে দেখতে হবে। যদি কোনো উন্নতি না হয় তাহলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য চিকিৎসকরা কিছু পরীক্ষা দিয়ে থাকেন। চিকিৎসকরা সাধারণত যেসব পরীক্ষা করতে দিয়ে থাকেন:

  • মূত্র পরীক্ষা
  • কোলেস্টেরল স্ক্রিনিং
  • রক্ত পরীক্ষা
  • ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইকেজি/ইসিজি)
  • হৃদপিণ্ড ও কিডনির
  • আল্ট্রাসোনোগ্রাফি

 

বিভিন্ন প্রকারের ব্লাড প্রেসার রিডিং



রক্তচাপের বিভিন্ন পাঠ থেকে উচ্চ রক্তচাপের ধরন সম্পর্কে খুব সহজেই ধারণা পাওয়া সম্ভব। রক্তচাপের পাঠ মূলত দুইটি সূচকে প্রকাশ করা হয়। উচ্চ সূচককে বলা সিস্টোলিক প্রেসার। আর নিম্নের সূচককে বলা হয় ডায়াস্টোলিক। মূলত ব্লাড প্রেসারের পাঠকে পাঁচভাগে ভাগ করা হয়।

স্বাস্থ্যকর রক্তচাপ: রক্তচাপ যদি ১২০/৮০ হয় তাকে স্বাস্থ্যকর রক্তচাপ বলে।

উচ্চ রক্তচাপ: সিস্টোলিক পাঠ যদি ১২০-১২৯ এবং ডায়াস্টোলিক পাঠ যদি ৮০ এর কম হয় তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। তবে এ ধরনের রক্তচাপের জন্য চিকিৎসকরা কোনো ঔষধ প্রদান করেন না। এক্ষেত্রে তারা লাইফস্টাইল পরিবর্তন করার কথা বলে থাকেন।

হাইপারটেনশন স্টেজ ওয়ান: সিস্টোলিক পাঠ ১৩০-১৩৯ এবং ডায়াস্টোলিক পাঠ ৮০-৮৯ হয় তাকে স্টেজ ওয়ান হাইপারটেনশন বলা হয়।

হাইপারটেনশন স্টেজ টু: সিস্টোলিক পাঠ ১৪০ বা তার বেশি এবং ডায়াস্টোলিক পাঠ ৯০ বা তার বেশি হলে তাকে হাইপারটেনশন স্টেজ টু বলা হয়।

হাইপারটেনসিভ ক্রাইসিস: সিস্টোলিক পাঠ ১৮০ এর বেশি এবং ডায়াস্টোলিক পাঠ ১২০ এর বেশি হলে তাকে হাইপারটেনসিভ ক্রাইসিস বলা হয়। এই মাত্রার রক্তচাপের ক্ষেত্রে জরুরী ভিত্তি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যদি রোগীর মাথাব্যথা, বুকে ব্যথা, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা এবং নিঃশ্বাসে হয় তাহলে তাকে দ্রুতে জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

 

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা

বিভিন্ন সূচকের উপর ভিত্তি করে চিকিৎসকরা উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে রোগীর কোন ধরনের হাইপার টেনশন রয়েছে এবং তার পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসকরা সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করে থাকেন।

যদি কোনো রোগী প্রাইমারি হাইপারটেনশন থাকে তাহলে চিকিৎসকরা তাকে লাইফস্টাইল পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাতে যদি কোনো কাজ না হয় তখন চিকিৎসকরা ঔষধ দিয়ে থাকেন।

অন্যদিকে সেকেন্ডারি হাইপারটেনশনের চিকিৎসা হিসেবে শুরু থেকেই নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ দেওয়া হয়। ঔষধ খাওয়ার পর রক্তচাপের গতিবিধি দেখে চিকিৎসকরা ঔষধ পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

 

উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ

উচ্চ রক্তচাপের জন্য বাজারে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ রয়েছে। তবে আগে নিশ্চিত হতে হবে কোন ঔষধ রোগীর দেহের সাথে কার্যকর হচ্ছে। সেই অনুযায়ী

চিকিৎসকরা ঔষধ নির্ধারণ করে থাকেন৷ এই রোগের জন্যে চিকিৎসকরা সাধারণত যে সকল ঔষধ প্রদান করে থাকেন:

বেটা-ব্লকার (Beta-blockers): বেটা-ব্লকার হার্টবিট ধীর করে দেয় এবং হার্টের চাপ কমায়। ফলে প্রতিবার হার্টবিট করার সময় আগের চেয়ে কম রক্ত পাম্প করে। ফলে রক্তচাপ কমে যায়। একই সাথে এই ঔষধ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এমন হরমোনের তৈরির গতিকে হ্রাস করে দেয়।

ডাই-ইউরেটিকস (Diuretics): শরীরের উচ্চ মাত্রার সোডিয়াম এবং অতিরিক্ত তরল রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। ডাই-ইউরেটিকস নামের এক ধরনের ট্যাবলেট খাওয়ার ফলে শরীরের অতিরিক্ত সোডিয়াম কিডনি মাধ্যমে বের হয়ে যায়।। সোডিয়াম বের হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত পানি মূত্র হিসেবে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়।

এসিই ইনহিবিটর্স (ACE inhibitors): অ্যানজিওটেনসিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ আমাদের রক্তনালী ও ধমনীকে শক্ত ও সরু করে দেয়। ফলে এসিই (অ্যানজিওটেনসিন কনভার্টিং এনজাইম) ইনহিবিটর্স দেহে অ্যানজিওটেনসিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তনালী শিথিল থাকে এবং রক্তচাপ কমে যায়।

অ্যানজিওটেনসিন টু রিসেপটর ব্লকার (Angiotensin II receptor blockers [ARBs]): এসিই ইনহিবিটর্স অ্যানজিওটেনসিনে উৎপান কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে এআরবি অ্যানজিওটেনসিনকে তার রিসেপটরদের সাথে বন্ধন সৃষ্টিতে বাধা দেয়।

ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার (Calcium channel blockers): এই ঔষধ হৃদপিণ্ডের অভ্যন্তরে ক্যালসিয়ামের প্রবেশে বাধা প্রদান করে। ফলে হৃদযন্ত্র কম চাপে হার্টবিট করে। এতে করে রক্তচাপ কমে যায়। এই ঔষধ রক্তনালীকে কিছুটা শিথিল করতে সাহায্য করে।

আলফা-২ অ্যাগোনিস্ট (Alpha-2 agonists): এই ঔষধ স্নায়ু তাড়না পরিবর্তন করে দেয়। যা সাধারণত পূর্বে রক্তনালিকে শক্ত করে দেয়। এই ঔষধ নেওয়ার পর রক্তনালি শান্ত থাকে এবং রক্তচাপ কমে যায়।

 

উচ্চ রক্তচাপের ঘরোয়া চিকিৎসা

উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা সুস্থ জীবনচর্চা। অর্থাৎ সঠিক লাইফস্টাইল মেনে চলা। তবে এর পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া চিকিৎসা পদ্ধতি যার মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা

খাবারের তালিকায় এমন সব খাবার রাখতে হবে যা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। এতে করে হৃদপিণ্ড ভালো থাকার পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। একই সাথে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও বিভিন্ন হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এজন্য প্রচুর পরিমাণ ফল, শাকসবজি, শস্যদানা এবং মাছ খেতে হবে।

দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ

অতিরিক্ত ওজন রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অবশ্যই ওজন কমাতে হবে। এজন্য স্বাস্থ্যকর ডায়েট ও কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

কায়িক পরিশ্রম বৃদ্ধি

দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কায়িক পরিশ্রম আবশ্যক। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস দুশ্চিন্তা কমানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। একই সাথে হৃদরোগকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। এ কারণে সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। অর্থাৎ সপ্তাহের পাঁচদিন গড়ে আধা ঘণ্টা। তবে এর পরিমাণ যত বৃদ্ধি পাবে রক্তচাপ তত বেশি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ

মানসিক চাপের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। এ কারণে যেকোনো মূল্যে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যায়ামের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পাশাপাশি ধ্যান, দীর্ঘ নিঃশ্বাস, ম্যাসেজ, পেশি শিথিলকরণ এবং যোগব্যায়ামের মাধ্যমে মানসিক অবসাদ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার

উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীর ধূমপানের অভ্যাস থাকলে অবশ্যই তা পরিহার করতে হবে। কারণ তামাক দেহের টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রক্তনালীকে শক্ত করে। পাশাপাশি মদপানের অভ্যাস থাকলে সেটাও পরিহার করতে হবে।

 

উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ডায়েট

রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণ করার সহজ পন্থা হলো স্বাস্থ্যকর ডায়েট৷ তার জন্য প্রয়োজন আহারে সঠিক খাবার বেছে নেওয়া। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ডায়েট যেমন হওয়া উচিত:

মাংস কম, সবজি বেশি

শাকসবজি নির্ভর ডায়েট শরীর ফাইবার বৃদ্ধি করে সোডিয়াম এবং ক্ষতিকর আনস্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ কমায়। মাংসের পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণে ফল, শাকসবজি, শস্যদানা ও সবুজ লতাপাতা খেতে হবে। প্রোটিনের ঘাটতি পূরণের জন্য লাল মাংসের পরিবর্তে মাছ, পোলট্রি ও টফু খেতে হবে।

সোডিয়াম খাওয়া কমাতে হবে

উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে যারা প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ২৩০০ মিলিগ্রাম সোডিয়াম গ্রহণ করেন তারা বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। ডায়েটে সোডিয়ামের পরিমাণ কমানোর জন্য খাবার সতেজ থাকা অবস্থায় রান্না করে খাওয়া উচিত। রেস্টুরেন্ট এবং প্যাকেটজাত খাবার পরিহার করা উত্তম।

মিষ্টি পরিহার

চিনি জাতীয় খাবার এবং বেভারেজে পুষ্টিকর কোনো খাদ্য উপাদান নেই। সুস্থ থাকতে হলে এসব খাবার পরিহার করতে হবে। যারা মিষ্টি খেতে ভালোবাসেন তারা সতেজ ফলমূল অথবা সামান্য পরিমাণে চিনিছাড়া ডার্ক চকোলেট খেতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত ডার্ক চকোলেট খাওয়ার ফলে রক্তচাপ কমে।

 

গর্ভবতী নারীদের করণীয়

উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও গর্ভবতী নারীরা সুস্থ সবল বাচ্চা জন্মদান করতে পারেন। তবে বাচ্চা পেটে থাকা অবস্থায় তাকে অবশ্যই নিয়মিত রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সতর্কতার সাথে চলাফেরা করতে হবে। গর্ভবতী নারীদের রক্তচাপের সমস্যা থাকলে তাদের কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এর ফলে অনেকের বাচ্চার ওজন কম হয় অথবা অকালে বাচ্চা প্রসব করেন।



অনেক নারীর গর্ভবতী থাকার সময় উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হন। এতে উচ্চ রক্তচাপ জনিত বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। গর্ভবতী অবস্থায় এই রোগ হলে পরবর্তীতে তা বৃদ্ধির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ

উচ্চ রক্তচাপকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়৷ একে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে চাইলে এই রোগকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন বিশেষ কিছু পদক্ষেপ। যেমন:

  • স্বাস্থ্যকর ডায়েট মেনে চলা
  • মাংস পরিহার করে প্রচুর পরিমাণ
  • মাছ, শাকসবজি ও সালাদ খাওয়া
  • চিনি পরিহার করা
  • ওজন কমানোর জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা
  • নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা।

 

রক্তচাপ নিয়ে যত ভুল ধারণা

রক্তচাপ বাড়লে ঘাড়ব্যথা হয়

ঘাড়ে ব্যথা হলে কেউ কেউ মনে করেন, নিশ্চয়ই রক্তচাপ বেড়েছে। এই ধারণা অমূলক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রক্তচাপ বৃদ্ধির কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। সাধারণত হাড়ের জোড়া বা সন্ধির সমস্যায় ঘাড়ব্যথা হয়ে থাকে।

রক্তচাপ বেশি থাকলে দুধ-ডিম নিষেধ

দুধ-ডিম-মাংস খেলে রক্তচাপ বাড়ে—এমন ধারণা ভুল। রক্তচাপ বেড়ে গেলে অনেকে দুধ-ডিম খাওয়া ছেড়ে দেন। কিন্তু আসলে লবণ বা লবণাক্ত খাবার বেশি খেলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। মূলত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, যেমন ডিমের কুসুম, দুধের সর, চর্বিযুক্ত মাংস ইত্যাদি খেতে নিষেধ করা হয়।

টক খেলে রক্তচাপ কমে

এই ধারণাও ভুল। রক্তচাপের পরিমাণ বেশি দেখলে কেউ কেউ তেঁতুলের পানি বা টক খান। লবণ মিশিয়ে এসব খেলে রক্তচাপ আরও বাড়তে পারে। আর লবণ ছাড়া খেলে অ্যাসিডিটির সমস্যা হয়।

লবণ ভেজে খাওয়া যাবে

উচ্চ রক্তচাপের জন্য কাঁচা লবণ খেতে নিষেধ করায় অনেকে লবণ হালকা ভেজে খান বা রান্নায় লবণের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। কিন্তু লবণ যেভাবেই খান না কেন, তা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেবে।

রক্তচাপ কমলে ওষুধ নয়

উচ্চ রক্তচাপের অনেক রোগী রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও থাকে।

সমস্যা নেই বলে ওষুধ বাদ দেবেন

রক্তচাপ বাড়তি থাকলেও শরীরে কোনো সমস্যা হচ্ছে না, এমন অজুহাতে কেউ কেউ ওষুধ খাওয়া বন্ধ করতে চান। আসলে উচ্চ রক্তচাপে তেমন কোনো উপসর্গ না থাকলেও এটি ধীরে ধীরে হৃদরোগ, পক্ষাঘাত, দৃষ্টিহীনতা ও কিডনি অকার্যকারিতার ঝুঁকি বাড়াবে।

দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা এড়াতেই আপনাকে ওষুধ দেওয়া হয়। অনেকে বলেন, এই ওষুধ শুরু করলে সারা জীবন খেতে হবে, তাই শুরু না করাই ভালো। এটাও বিপজ্জনক চিন্তা। প্রয়োজন হলে ওষুধ অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা উচিত, নয়তো জটিলতা বাড়বে।

রক্তচাপ বৃদ্ধির কারণ টেনশন

মানসিক চাপ, উদ্বেগ ইত্যাদি কিছুটা দায়ী বটে। তবে কেবল মানসিক উৎকণ্ঠা উচ্চ রক্তচাপের একমাত্র কারণ নয়।

অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন, ওজনাধিক্য, ধূমপান, মদ্যপান, তেল-চর্বিজাতীয় খাবার, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ প্রভৃতি উচ্চ রক্তচাপের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনাচরণ পরিবর্তন করে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারবেন।

অন্যের ওষুধে ভালো কাজ হয়

উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে আপনার বয়স, উচ্চ রক্তচাপের তীব্রতা, আনুষঙ্গিক অন্য রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস, হাঁপানি, প্রোস্টেটের সমস্যা, গর্ভাবস্থা ইত্যাদি) অনেক বিষয় বিবেচনা করেই রক্তচাপ কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়।

কোনো ওষুধ কারও জন্য প্রয়োজনীয়, আবার একই ওষুধ অন্য কারও জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই যে ওষুধে অন্যের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেটা আপনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়ার চিন্তাও করবেন না।

Source: https://www.healthline.com/health/high-blood-pressure-hypertension?ref=global#preventing-high-blood-pressure
https://www.prothomalo.com/amp/life-style/article/1068191/%E0%A6%89%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%9A-%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%AA-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A7%AE-%E0%A6%AD%E0%A7%81%E0%A6%B2-%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%A3%E0%A6%BE


Notice: Function Elementor\Controls_Manager::add_control_to_stack was called incorrectly. Cannot redeclare control with same name "_skin". Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 1.0.0.) in /home/mxumgquj/sustho.com/wp-includes/functions.php on line 5831
আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট




Categories

ফুসফুসে ইনফেকশন হলে কি করবেন

ফুসফুসের সমস্যা ও সমাধান

কথায় আছে, দমে জীবন, দমে মরণ। আর মানুষসহ সকল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দম তথা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে ফুসফুস। একে বলা হয় শ্বাসযন্ত্র। ফুসফুসের প্রধান কাজ বাতাস থেকে অক্সিজেনকে রক্তপ্রবাহে নেওয়া এবং রক্তপ্রবাহ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছেড়ে দেওয়া। এই দুটি গ্যাসের আদান-প্রদান হয় বিশেষ ধরনের এক কোষ দ্বারা তৈরি খুবই পাতলা লক্ষাধিক বায়ুথলির মাধ্যমে। যাকে বলা হয় অ্যালভিওলাই।

 

ফুসফুস ইনফেকশনের লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ

মানবদেহের যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে তার মধ্যে ফুসফুস অন্যতম। কেননা এর মাধ্যমেই আমরা বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অক্সিজেন পাই। আবার আমাদের দেহের জন্য ক্ষতিকর কার্বন ত্যাগ করি। আমরা অনেক সময় বিভিন্নজনকে শ্বাসকষ্টে ভুগতে দেখি। এর কারণ হলো ফুসফুসের ইনফেকশন। শ্বাসকষ্ট হলো ফুসফুস ইনফেকশনের অতি সাধারণ এক রোগ। কিন্তু এর বাইরে আরো অনেক জটিল রোগ হতে পারে যদি আমাদের বায়ুথলি কোনো কারণে সংক্রমিত হয়।

 

ফুসফুসের ইনফেকশন কী

মূলত নাক ও মুখের মধ্যে দিয়ে যদি কোনো ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস দেহের ভেতরে প্রবেশ করে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে তাহলে তাকে ফুসফুসের ইনফেকশনের বলে। ফুসফুসের ইনফেকশনের হলে অনেক সময় শ্বাসনালী ফুলে যায়৷ যার ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হয়। ফুসফুস যেহেতু আমাদের দেশে একাধিক কার্য সম্পাদন করে থাকে তাই ফুসফুস সংক্রমিত হওয়ার ফলে শ্বাসকষ্ট ছাড়াও আরো অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। শিশু বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সকলেরই এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।



ফুসফুস ইনফেকশনের লক্ষণ

ফুসফুস ইনফেকশনের লক্ষণগুলো মাঝারি থেকে তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে৷ তবে সেটা নির্ভর করে রোগীর বয়স, স্বাস্থ্যের সর্বোপরি অবস্থা এবং ইনফেকশনের কারণ। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক, এর মধ্যে যেকোনো একটির আক্রমণে ফুসফুস সংক্রমিত হলে তার লক্ষণ প্রকাশ পায়৷ কিন্তু লক্ষণগুলো কখনো আলাদাভাবে বোঝা যায় না। তবে অনেক সময় লক্ষণ সমূহের স্থায়ীত্বতা থেকে ফুসফুস ইনফেকশনের কারণ বোঝা যায়৷ এবার তাহলে ফুসফুস ইনফেকশনের সাধারণ লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

ফুসফুস ইনফেকশনের প্রধান লক্ষণ কফের সাথে ঘন শ্লেষ্মা বা মিউকাস বের হওয়া। রোগীভেদে এই মিউকাসের রং ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে খারাপ দিক হলো কফের সাথে রক্ত পড়া৷ যদি কারো কফের সাথে রক্ত পড়ে তাহলে বুঝতে হবে তার ফুসফুসে ইনফেকশন হয়েছে এবং তার অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ফুসফুসে ইনফেকশনের কারণে শ্বাসকষ্ট হয়৷ যার ফলে বুকে ব্যথা সৃষ্টি হয়। এই ব্যথা কখনো মাঝারি, আবার কখনো মারাত্মক আকারে হয়ে থাকে৷ ফুসফুসের ইনফেকশনের কারণে একনাগাড়ে কয়েকদিন বুকে ব্যথা অনুভব হয়।

অনেক সময় ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার কারণে আমাদের শরীরে জ্বর হয়ে থাকে। আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের কারণে যদি ফুসফুস সংক্রমিত হয় তাহলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে। অতিরিক্ত জ্বরের কারণে শরীরে ঘাম, পানিশূন্যতা, মাথাব্যথা ও দুর্বলতাসহ আরো অনেক লক্ষণ দেখা দেয়। যদি শরীরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ফুসফুস ইনফেকশনের কারণে পেশি ও পিঠে ব্যথা হয়। একে মায়ালজিয়া বলা হয়। এর ফলে অনেক সময় পেশির মধ্যে প্রদাহ সৃষ্টি হয়।

ফুসফুস সংক্রমিত হলে নিঃশ্বাসে দুর্বলতার সমস্যা সৃষ্টি হয়। এর ফলে শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে যায় এবং ঘনঘন শ্বাস নেওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

প্রশ্বাসের মাধ্যমে যখন বায়ু ত্যাগ করা হয় তখন যদি বুকের মধ্যে আওয়াজ হয়৷ যা ফুসফুস ইনফেকশনের স্পষ্ট লক্ষণের মধ্যে একটি। মূলত শ্বাসনালি ছোট সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে এই সমস্যা হয়।

ফুসফুস সংক্রমিত হলে রক্তে অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়৷ ফলে আমাদের শরীর খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অল্পতেই শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লে তা ফুসফুসের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

ফুসফুসের ইনফেকশনের কারণে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়৷ ফলে ঠোঁট ও হাতের নখ হালকা নীলাভ বর্ণ ধারণ করে।

 

ফুসফুস ইনফেকশনের কারণে যেসব রোগ হয়

ফুসফুস ইনফেকশনের কারণে অসংখ্য রকমের রোগ হয়ে থাকে। তবে প্রধান তিনটি রোগ হলো ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিস। এর প্রত্যেকটি ভাইরাস অথবা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়ে থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস অথবা রেসপিরেটরি সিনশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি) আক্রমণে ব্রঙ্কাইটিস হয়ে থাকে। অন্যদিকে ব্রঙ্কাইটিসের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে রয়েছে মাইক্রোপ্লাজমা নিউমোনিয়ে, ক্লামাইডিয়া নিউমোনিয়ে এবং বোর্ডেটেলা পার্টুসিস। নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী স্ট্রেপটোকোকাস নিউমোনিয়া ও মাইক্রোপ্লাজমা নিউমোনিয়ে ভাইরাস এবং আরএসভি ব্যাকটেরিয়া।

প্রধান তিনটি রোগ ছাড়াও ফুসফুসের ইনফেকশন থেকে অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ হয়ে থাকে। ফুসফুসের সমস্যার কারণে রক্তনালি ও বুকে আরো বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে৷ তাই এই রোগকে কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই।

 

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন

সময়মত চিকিৎসা গ্রহণ না করলে ফুসফুস ইনফেকশন মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। যদি কারো তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশি হয় অথবা শ্বাস-প্রস্বাসে সমস্যা হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে চিকিৎসক দেখানোর ক্ষেত্রে বয়স ও রোগের কিছু সাধারণ লক্ষণ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তিন মাসের কম বয়সী কোনো বাচ্চার যদি একনাগাড়ে কয়েকদিন ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর থাকে তাহলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উত্তম। ৩-৬ মাস এবং ৬-২৪ মাস বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জ্বরের এই মাত্রা ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি৷ আর জ্বরের স্থায়ীত্ব হতে হবে কমপক্ষে দুই দিন। এর চেয়ে অধিক বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে টানা তিনদিন ১০২.২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বরের পাশাপাশি যদি বমি ও প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। বড়দের ক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা ১০৩ ডিগ্রির বেশি হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া আবশ্যক।

 

ফুসফুসের ইনফেকশন নির্ণয়ের টেস্ট

শ্বাস-প্রস্বাসে কোনো সমস্যা হলে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এরপর চিকিৎসকের কাছে পূর্বের সকল রোগ এবং শরীরের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খুলে বলতে হবে। এমনকি আপনি কোন ধরনের পেশার সাথে জড়িত, কোন এলাকায় থাকেন, সর্বশেষ কোথায় ভ্রমণ করেছেন কিংবা কোন কোন প্রাণীর সংস্পর্শে ছিলেন সবকিছুই চিকিৎসকের কাছে বলতে হবে। সাধারণত চিকিৎসকরা নিজে থেকে এসব প্রশ্ন করে থাকেন। এরপরও নিজে থেকে এই বিষয়গুলো বিস্তারিত জানানো উচিত।

চিকিৎসক সাধারণত শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বুকের ভেতরে কোনো শব্দ হয় কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে দেন। এর মধ্যে রয়েছে বুকের এক্স-রে অথবা সিটি স্ক্যান, নিঃশ্বাসের গতি পরিমাপের জন্য স্পাইরোমেট্রি টেস্ট, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য পালস অক্সিমেট্রি, কফ পরীক্ষা, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) টেস্ট এবং ব্লাড কালচার টেস্ট।



ফুসফুস ইনফেকশন হলে করণীয়

চিকিৎসকের দেওয়া পরীক্ষা থেকে যদি ফুসফুসের ইনফেকশন ধরা পড়ে তাহলে তার ধরন অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ করতে হবে। ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের জন্য সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। কিন্তু ভাইরাল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। এর বিরুদ্ধে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা লড়াই করে। অনেক সময় তা দীর্ঘায়িত হয়। আর ছত্রাকের কারণে যদি ফুসফুসের ইনফেকশন হয় তাহলে ছত্রাক প্রতিরোধী হিসেবে কিটোকোনাজল অথবা ভোরিকোনাজল গ্রহণ করতে হয়।

তবে ঔষধের পাশাপাশি কিছু খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ফুসফুসের ইনফেকশন থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়। এই ইনফেকশন থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রচুর পানি পান করতে হবে, সেই সাথে আদা বা মধুর সাথে চা খেতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রামে থাকতে হবে। লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি করলে ফুসফুসের ইনফেকশন দ্রুত উপশম হয়। আর কোনোভাবেই অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স শেষ না করে ঔষধ বন্ধ করা যাবে না।

 

ফুসফুসে ইনফেকশন হলে কিভাবে প্রতিরোধ করবেন

ফুসফুস ইনফেকশন পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও একটু সচেতন হলেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এই রোগ সরাসরি পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার উপর নির্ভরশীল। তাই দূষিত ধূলিকণা থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরে গেলে নাক ও মুখে মুখোশ লাগিয়ে চলাফেরা করা উচিত।

নিয়মিত হাত পরিস্কার রাখার পাশাপাশি বারবার ফেস ও মুখ হাতানো থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদের সাথে খাবারের কোনো পাত্র, খাবার ও পানীয় শেয়ার না করা উত্তম। পাশাপাশি জনবহুল জায়গাগুলো এড়িয়ে চলা ভালো৷ কারণ এসব জায়গা থেকে খুব সহজে ভাইরাস ছড়ায়।

ফুসফুসের যেকোনো সমস্যা থেকে দূরে থাকার জন্য ধূমপান থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে। এর পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনকে প্রতিরোধ করার জন্য দুই ধরনের ভ্যাকসিন রয়েছে। যথা: পিসিভি১৩ নিউমোকাকাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (PCV13 pneumococcal conjugate vaccine) এবং পিপিএসভি২৩ নিউমোকাকাল পলিস্যাকারাইড ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিন শিশু থেকে শুরু করে সকল বয়সী মানুষ নিতে পারবেন।

Source:

https://www.healthline.com/health/symptoms-of-lung-infection
https://www.webmd.com/lung/lung-diseases-overview
https://www.betterhealth.vic.gov.au/health/conditionsandtreatments/chest-infections
https://www.lung.org/lung-health-and-diseases/lung-disease-lookup/pneumonia/learn-about-pneumonia.html
https://www.nhs.uk/conditions/respiratory-tract-infection/
https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4798234/

আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট




Categories

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও ঔষধ | টাইফয়েড হলে করনীয়

টাইফয়েড আমাদের অতি পরিচিত একটি রোগ। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে শীত শেষ হওয়ার পর গরম পড়তে শুরু করলে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়ে যায়। টাইফয়েড এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ।

মূলত সালমোনালা টাইফিমিউরিয়াম বা এস. টাইফি ও প্যারা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে এই রোগ হয়। মানুষ ব্যতীত অন্য কোনো প্রাণী এই রোগ বহন করে না। তাই টাইফয়েড আক্রান্ত ব্যক্তিকে যথাসময়ে চিকিৎসা প্রদান না করলে তার আশেপাশের অন্যদের মধ্যে এই রোগ খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

 

টাইফয়েড কেন হয়

টাইফয়েড রোগ মূলত দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। টাইফি ব্যাকটেরিয়া যুক্ত পানি ও খাবার খাওয়ার ফলে টাইফয়েড জ্বর হয়৷ এই ব্যাকটেরিয়া মূলত বাসা-বাড়িতে সরবরাহ করা পানি ও সিউয়েজ লাইন থেকে ছড়ায়। এছাড়া টাইফয়েড আক্রান্ত রোগীর মলমূত্র থেকেও টাইফি ব্যাকটেরিয়া পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।


একবার দূষিত পানি ও খাবারে সাথে টাইফয়েডের ব্যাকটেরিয়া মানুষের দেহে প্রবেশের পর তা কয়েক সপ্তাহ অন্ত্রের মধ্যে থাকে। সেখানে এই ব্যাকটেরিয়া পুরোপুরি শক্তিশালী হওয়ার পর তা অন্ত্রের গাত্র ও রক্তনালির মধ্য দিয়ে দেহের অন্যান্য কোষ ও অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। টাইফি ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের দেহের ইমুউন সিস্টেম খুব বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। ফলে খুব সহজেই এই ব্যাকটেরিয়া মানুষকে কাবু করে ফেলে।

টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৩-৫% ব্যক্তি এই ব্যাকটেরিয়া বহনকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। বাকিদের অনেকে সামান্য মাত্রা আক্রান্ত হয়৷ কেউ কেউ আবার টাইফি ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যে রোগের কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কিন্তু এদের শরীরে দীর্ঘদিন এই ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে। পরবর্তী সময়ে এদের মাধ্যমেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

 

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ

ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের ৬ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ সমূহ প্রকাশ হতে শুরু করে। টাইফয়েডের প্রধান দুটি লক্ষণ হলো জ্বর ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। টাইফয়েড আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বরের মাত্রা সাধারণ জ্বরের চেয়ে অনেক বেশি হয়। জ্বর ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠে যায়৷ জ্বরের পাশাপাশি ঘাড় ও তলপেটে লালচে রঙের ফুসকুড়ি উঠে থাকে৷ তবে টাইফয়েডে আক্রান্ত সকলেরই ফুসকুড়ি উঠে না।

এর বাইরে টাইফয়েড আক্রান্ত ব্যক্তির প্রচণ্ড মাথাব্যথা, গলাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও শরীর দুর্বল হয়। অনেক টাইফয়েড রোগীর ডায়রিয়া ও বমি হয়। টাইফয়েড যদি মারাত্মক আকার ধারণ করে তাহলে অন্ত্রে ছিদ্রের সৃষ্টি হয়। যা থেকে অন্ত্রের ঝিল্লিতে প্রচণ্ড প্রদাহ হয়। তবে এই ঘটনা খুবই কম সংখ্যক রোগীর সাথে হয়ে থাকে। আরেক ধরনের টাইফয়েড রয়েছে যাকে বলা হয় প্যারা টাইফয়েড। এই রোগের লক্ষণসমূহ টাইফয়েড রোগের মতোই। কিন্তু এটা টাইফয়েডের চেয়ে কিছুটা দুর্বল।

 

টাইফয়েড টেস্ট

সাধারণত রক্ত, মল ও মূত্রের পরীক্ষার মাধ্যমে টাইফয়েড নির্ণয় করা হয়। রোগীর এসব নমুনা মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরীক্ষা করে সালমোনেলা টাইফি ভাইরাসের উপস্থিতি আছে কিনা তা যাচাই করা হয়।  অনেক সময় প্রথমবারের পরীক্ষায় টাইফয়েড ধরা পড়ে না। এ কারণে বেশ কয়েকবার একই ধরনের পরীক্ষা করে টাইফয়েড হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা হয়।

তবে বোন ম্যারো পরীক্ষার মাধ্যমে সূক্ষ্মভাবে টাইফয়েড নির্ণয় করা যায়। কিন্তু পরীক্ষা ও নমুনা গ্রহণ, উভয়ই বেশ জটিল ও কষ্টকর। তাই অন্য পরীক্ষায় যদি কোনোভাবে টাইফয়েড ধরা না পড়ে তবেই বোন ম্যারো টেস্ট করা হয়। যদি পরিবারের একজনের টাইফয়েড ধরা পড়ে তাহলে অন্য সদস্যদেরও টাইফয়েড পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কেননা টাইফয়েডে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে অন্যরা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

 

টাইফয়েড হলে করণীয়

রক্ত পরীক্ষা: টাইফয়েড পানিবাহিত জীবাণুর মাধ্যমে ছড়ায়। তাই টাইফয়েডের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে সবার আগে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। রক্ত পরীক্ষা থেকে নিশ্চিত হতে হবে টাইফয়েড হয়েছে কিনা।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে: টাইফয়েড হওয়ার অন্যতম কারণ নোংরা পরিবেশ। তাই টাইফয়েড রোগ থেকে দূরে থাকতে হলে এবং টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করতে হবে। নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ফলমূল ধুঁয়ে খেতে হবে। ঘরের সকল জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা করে রাখতে হবে।

পানি ও খাবারে সতর্কতা: টাইফয়েডে আক্রান্ত হলে পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। ঠাণ্ডা কোনো খাবার খাওয়া যাবে না৷ প্রয়োজনে গরম করে খেতে হবে। অপরিষ্কার শাক-সবজি ও ফলমূল খাওয়া যাবে না।

বাসস্থান ও টয়লেটের ব্যবস্থা: সবসময় বাসস্থান ও টয়লেট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। টয়লেট অথবা ঘরে যেন নোংরা পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির টয়লেট ও নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তিতে খোলামেলা পরিবেশে রাখতে হবে।

 

টাইফয়েড হলে যেসব খাবার খাবেন

চিকিৎসকদের মতে টাইফয়েডের যেকোনো রোগীর উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার খাওয়া উচিত। কেননা উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার টাইফয়েডের কারণে ওজন হ্রাস হওয়া প্রতিরোধ করে। এ কারণে এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগীকে পাস্তা, সেদ্ধ আলু, সাদা রুটি ও কলা খেতে দিতে হবে।

টাইফয়েডের রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। কারণ টাইফয়েডের কারণে অনেক সময় ডায়রিয়া হতে পারে। যার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। শরীরে পানির পরিমাণ কমে টাইফয়েডের চিকিৎসাতেও সমস্যা হয়। তাই টাইফয়েড আক্রান্ত রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, প্রচুর পানিযুক্ত ফল ও অন্যান্য খাবার এবং ফলের রস খাওয়াতে হবে।

অধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার দিতে হবে। হালকা শক্ত ও হালকা নরম জাতীয় খাবার সহজেই পরিপাক হয়। এ জন্য টাইফয়েডের রোগীদের ভাত, ভাজা আলু ও ডিম পোচ খেতে দিতে হবে। এই খাবারগুলো টাইফয়েডেে রোগীদের জন্য খুবই উপকারী।

টাইফয়েডে আক্রান্তদের প্রচুর পরিমাণে দুগ্ধজাত খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি তাদের খাঁটি মধু খাওয়ালে দ্রুত রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করবেন।

টাইফয়েড রোগীর ডায়েটে অবশ্যই দই ও ডিম রাখতে হবে। এগুলো খুব তাড়াতাড়ি পরিপাক হয়। যা টাইফয়েড রোগীদের দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি দেহের প্রোটিনের অভাব পূরণ করে। তবে যারা নিরামিষভোজী তারা দই ও ডিমের পরিবর্তে মসুরের ডাল, মাষকলাই ও কটেজ চিজ খেতে পারেন।

 

যেসব খাবার খাওয়া যাবে না

টাইফয়েড রোগীদের প্রচুর পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। এ ধরনের খাবার হজম হতে অনেক সময় লাগে।

ক্যাপসিকাম ও বাঁধাকপির মতো গ্যাস সৃষ্টিকারী সবজি পরিহার করতে হবে। এই খাবারগুলো পেটে গ্যাস তৈরি করে এবং পেট ফেঁপে যায়।

রসুন ও পেঁয়াজ বেশি খাওয়া যাবে না। এমন ফ্লেভারযুক্ত অন্য কোনো সবজিও খাওয়া যাবে না।

মসলাদার ও এসিটিক এসিড সৃষ্টিকারী খাবার খাওয়া খাবে না। যেমন: হট সস, কাঁচামরিচ ও ভিনেগার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঘি, মাখন, ডেজার্ট ও ভাজাপোড়া খাবার পরিহার করতে হবে।

 

টাইফয়েডের চিকিৎসা



টাইফয়েড সাধারণত ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়৷ তবে ক্ষেত্র বিশেষে আরো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। টাইফয়েডের চিকিৎসা সাধারণত বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিকগুলো সাধারণত টাইফয়েডের ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে। সচরাচর এই রোগের চিকিৎসায় সিপ্রোফ্লোক্সাসিন (সিপ্রো), অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও সেফট্রিয়াক্সোন।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত গর্ভবতী ব্যতীত অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসকরা সিপ্রোফ্লোক্সাসিন দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশেও টাইফয়েডের রোগীদের এই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না। বাদ নেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও। যে সকল রোগী সিপ্রোফ্লক্সাসিন নিতে পারেন না কিংবা এই অ্যান্টিবায়োটিক যাদের শরীরে কোনো কাজ করে না তাদের টাইফয়েড চিকিৎসায় অ্যাজিথ্রোমাইসিন দেওয়া হয়।

আর যাদের টাইফয়েডের মাত্রা অনেক বেশি এবং বাচ্চাদের সিপ্রোফ্লক্সাসিনের পরিবর্তে সেফট্রিয়াক্সোন অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশনের মাধ্যম্যে শরীরে দেওয়া হয়। তবে এসব অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দীর্ঘদিন এসব ঔষুধ ব্যবহার করলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিসট্যান্ট তৈরি হতে পারে। আর টাইফয়েডের ফলে যদি কারো অন্ত্রে ছিদ্র হয় তাহলে তাকে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে অস্ত্রোপচার করতে হবে।

 

টাইফয়েডের ভ্যাকসিন

টাইফয়েড প্রতিরোধ করার জন্য মূলত দুই ধরনের ভ্যাকসিন রয়েছে। এক. ভিআই অ্যান্টিজেন বা ভিআই-পিএস (Vi-PS) ভ্যাকসিন। অপরটি হলো টিওয়াই-২১ ভ্যাকসিন। ভিআই ভ্যাকসিন সাধারণত ইনজেকশনের মাধ্যমে একবার দেওয়া হয়। যা প্রায় ৩ বছর পর্যন্ত ৭০ ভাগ টাইফয়েড প্রতিরোধ করে। অপরদিকে টিওয়াই-২১ ভ্যাকসিন ক্যাপসুল আকারে খেতে হয়। ভিন্ন ভিন্ন দিনে মোট তিনটি ক্যাপসুল খেতে হয়। এই ভ্যাকসিন দীর্ঘদিন টাইফয়েডের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম।

 

Source:

1. https://doctor.ndtv.com/living-healthy/typhoid-diet-foods-to-eat-and-avoid-during-typhoid-1879975?amp=1#aoh=15741785461923&referrer=https%3A%2F%2Fwww.google.com&amp_tf=From%20%251%24s
2. https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/typhoid-fever/diagnosis-treatment/drc-20378665
3. https://www.who.int/immunization/research/development/typhoid/en/
4. https://www.nhs.uk/conditions/typhoid-fever/vaccination/
5. https://www.webmd.com/a-to-z-guides/typhoid-fever
6. https://www.medicalnewstoday.com/articles/156859.php

আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট




Categories

হরেক রকম বাদামের হরেক রকমের উপকারিতা | বাদাম খাওয়ার নিয়ম

বাদাম খেলে কি হয় | বাদাম খাওয়ার উপকারিতা

বন্ধুদের আড্ডায় বাদাম এক অতি পরিচিত খাবার। বছরের পুরো সময়ই ছোট থেকে বড়, সব দোকানেই বাদাম কিনতে পাওয়া যায়। সাধারণত আমরা যে বাদাম খেয়ে থাকি তার নাম চীনা বাদাম। কিন্তু এই বাদাম ছাড়া আরো অনেক রকমের বাদাম রয়েছে। প্রত্যেক বাদামেরই রয়েছে আলাদা আলাদা পুষ্টিগুণ এবং ব্যবহার।

বাদামের প্রকারভেদ

সারাবিশ্বে অসংখ্য রকমের বাদাম রয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্যের কারণে একেক অঞ্চলে একেক রকমের বাদাম উৎপন্ন হয়। তবে সারাবিশ্বে মোটামুটি ১০-১২ রকমের বাদাম রয়েছে যেগুলো প্রায় সকলের কাছেই পরিচিত।

সহজলভ্যতা ও বহুল ব্যবহারের দিক থেকে যেসব বাদাম আমাদের কাছে অধিক পরিচিত সেগুলো হলো কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, কাজুবাদাম, পেস্তাবাদাম, ব্রাজিলিয়ান বাদাম, চেস্ট নাট ( এক ধরনের গোলাকার বাদাম), হ্যাজেল নাট, ম্যাকাডেমিয়া বাদাম, পিক্যান বাদাম, পিলি বাদাম, পাইন বাদাম ও আখরোট।

বাদাম খাওয়ার উপকারিতা



বাদামে উচ্চমাত্রায় ফ্যাট থাকে। কিন্তু এই ফ্যাট শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং উপকারী। এছাড়া বাদাম ফাইবার ও প্রোটিনের ভালো উৎস। বিভিন্ন গবেষণা থেকে বাদামের নানাবিধ উপকারের কথা জানা গেছে। বিশেষ করে বাদাম খাওয়ার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। এছাড়া বাদামের আরো যেসকল উপকারিতা রয়েছে সে সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

পুষ্টি উপাদানের বড় উৎস: বাদামে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে যার প্রত্যেকটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ৩০ গ্রাম বিভিন্ন ধরনের বাদাম থেকে ১৭৩ ক্যালরি পাওয়া যায়। এছাড়া প্রোটিন ৫ গ্রাম, ফ্যাট ১৬ গ্রাম, ফাইবার ৩ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ৬ গ্রাম পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি বাদামে ভিটামিন ই, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, কপার, ম্যাঙ্গানিজ ও সেলেনিয়াম থাকে।

অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর: বাদামকে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের পাওয়ার হাউস বা শক্তিঘর বলা হয়। বিশেষ করে আখরোট ও কাঠবাদামে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টি অক্সিডেন্ট পাওয়া যায় যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির ঝুঁকি কমায়।

বাদাম ওজন কমাতে সহায়ক: বাদামকে উচ্চ ক্যালরি সম্পন্ন খাবার মনে করা হয়। কিন্তু বাদাম খাওয়ার ফলে ওজন বাড়ে না। বরং তা ওজন কমাতে সাহায্য করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়েটে অলিভ অয়েলের চেয়ে বাদাম খেলে দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব। ওজন কমানোর জন্য কাঠবাদাম খুবই উপকারী। কাজুবাদামেরও একই গুণ রয়েছে।

যে সকল নারী অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন তাদের ডায়েটে বাদাম রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। কারণ ডায়েটে বাদাম রাখলে অন্য নারীদের চেয়ে তিনগুণ দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব। অনেকে অতিরিক্ত ফ্যাট থাকার কারণে বাদাম খেতে চান না। তাদের জন্য আশার বাণী হলো আমাদের শরীর বাদামে থাকা ফ্যাট পুরোপুরি শোষণ করে না। যার ফলে বাদামে অতিরিক্ত ফ্যাট থাকলেও বাদাম খেয়ে মোটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

বাদাম কোলেস্টেরল ও টাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমায়: অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ও টাইগ্লিসারাইডের ফলে শরীর মুটিয়ে যায় এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যদি নিয়মিত বাদাম খাওয়া হয় তাহলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি করা সম্ভব। বিশেষ করে পেস্তাবাদাম টাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমায়। প্রায় ১২ সপ্তাহের এক গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত পেস্তাবাদাম খান, তাদের শরীরে টাইগ্লিসারাইড প্রায় ৩৩% কম। আর কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণ করে বাদামের ফ্যাটি এসিড।

কাঠবাদাম ও হ্যাজেল নাট খাওয়ার ফলে শরীরের জন্য ক্ষতিকর নিম্ন ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন (এলডিএল) কমিয়ে উপকারী উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিনের মাত্রা বাড়ে। কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আখরোট, চিনাবাদাম, পাইন বাদাম ও ম্যাকাডেমিয়া নাটও খুবই উপকারী। এই বাদামগুলো যেভাবে খুশি খেতে পারেন।

প্রদাহ কমাতে সহায়ক: বাদামের মধ্যে প্রদাহ বিরোধী উপাদান রয়েছেন। কোনো চোট, ব্যাকটেরিয়া কিংবা অন্য কোনো কারণে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি হলে বাদাম খাওয়া উত্তম। নিয়মিত বাদাম খেলে ক্ষণস্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। বিশেষ করে যারা কিডনি ও ডায়াবেটিসের সমস্যা ভুগছেন। এর জন্য খেতে হবে আখরোট, পেস্তাবাদাম, কাঠবাদাম ও ব্রাজিলিয়ান বাদাম।

ফাইবারের ভালো উৎস: ফাইবার আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন খাবারে ফাইবারের অভাব হয় তখন আমাদের শরীরের মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার ঘটে। ফাইবার খাবার হজমে সহায়তা করার পাশাপাশি খাবারের ক্যালরির মাত্রা কমিয়ে দেয়। যার ফলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমা হতে পারে না। কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম, চিনাবাদাম, পিক্যান, হ্যাজেলনাট, ম্যাকাডেমিয়া বাদাম ও ব্রাজিলিয়ান বাদামে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে।

বাদাম হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: হৃদযন্ত্রের জন্য বাদাম খুবই উপকারী। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, বাদাম খেলে হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়৷ যার ফলে হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। একই সাথে স্ট্রোক করার ঝুঁকি হ্রাস পায়।

কাজুবাদামের উপকারিতা

নিয়মিত কাজুবাদাম খেলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কম থাকে।

কাজুবাদামে উচ্চমাত্রায় কপার থাকে। যা রক্তের দূষিত কণিকা দূর করে রক্তে লৌহের মাত্র বাড়ায়। ফলে রক্তের বিভিন্ন রোগ হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

কাজুবাদামে জিয়া জ্যানথিন নামে এক ধরনের শক্তিশালী পিগমেন্ট থাকে, যা আমাদের চোখকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে।

কাজুবাদামে উচ্চমাত্রায় সেলেনিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন ও ফসফরাস থাকে। সেলেনিয়াম আমাদের ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়া সেলেনিয়াম ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও কাজ করে।

কাজুবাদাম ওজন কমাতে সহায়তা করে। এই বাদাম ফাইবারের বড় এক উৎস। নিয়মিত কাজুবাদাম খেলে চুল উজ্জ্বল ও ঘন হয়।

কাজুবাদামের অপকারিতা

অনেক গুনাগুনের পাশাপাশি কাজুবাদামের বিভিন্ন ধরনের অপকারিতাও রয়েছে। অতিরিক্ত কাজুবাদাম খাওয়ার ফলে ওজন বেড়ে যায়৷ এছাড়া কাজুবাদামে উচ্চমাত্রায় ম্যাগনেসিয়াম থাকার ফলে অনেক অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা মন্থর করে দেয়। যাদের এলার্জির সমস্যা রয়েছে তাদের কাজুবাদাম খেলে সমস্যা হতে পারে। এছাড়া কাঁচা কাজুবাদামের মধ্যে থেকে এক ধরনের বিষাক্ত তরল বের হয় যা শরীরে লাগলে ঘা হয়ে যায়৷ এ কারণে বাজারে খোলযুক্ত কাঁচা কাজুবাদাম পাওয়া যায় না।

কাঠবাদামের উপকারিতা

কাঠবাদাম হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।

মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাঠবাদাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কাঠবাদামে থাকা ভিটামিন -ই ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আমাদের ত্বক সুস্থ রাখে।

কাঠবাদাম ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করে।

কাঠবাদাম ওজন বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস প্রতিরোধ করে।

কাঠবাদাম খাওয়ার পরে শরীরে পুষ্টি উপাদান শোষণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

কাঠবাদাম পাকস্থলির পরিপাক ক্রিয়া ঠিক রাখতে সহায়তা করে।

এই বাদাম শরীরের প্রদাহ কমায় এবং ক্যানসার প্রতিরোধ করে।



কাঠবাদামের অপকারিতা

অতিরিক্ত কাঠবাদাম খাওয়ার ফলে হজমের সমস্যা হয়।

১০০ গ্রাম কাঠবাদামে ২৫ গ্রাম ভিটামিন-ই থাকে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ দিনে সর্বোচ্চ ১৫ গ্রাম ভিটামিন-ই গ্রহণ করতে পারেন। অতিরিক্ত ভিটামিন-ই গ্রহণের ফলে ডায়রিয়া, শরীর দুর্বল ও চোখের জ্যোতি কমে যেতে পারে।

অতিরিক্ত কাঠবাদাম খাওয়ার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়।

অতিরিক্ত কাঠবাদাম খেলে শরীরে রক্তচাপের ঔষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করতে পারে না।

গর্ভবর্তী মহিলাদের অতিরিক্ত কাঠবাদাম খেলে বাচ্চার সমস্যা হতে পারে।

চিনাবাদামের উপকারিতা

বায়োটিনের বড় উৎস চিনাবাদাম। বায়োটিনকে ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের সাথে তুলনা করা হয়। বায়োটিন স্কোরোসিস, ডায়াবেটিস ও মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চিনাবাদামে শতকরা ৮০ ভাগ অসম্পৃক্ত ফ্যাট থাকে যা হৃদযন্ত্রের জন্য খুবই উপকারী। নিয়মিত চিনাবাদাম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কম থাকে।

চিনাবাদামে পর্যাপ্ত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

চিনাবাদাম পিত্তথলিতে পাথর হওয়া প্রতিরোধ করে।

চিনাবাদাম মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

চিনাবাদামের অপকারিতা

অতিরিক্ত চিনাবাদাম খেলে ওজন বৃদ্ধি পায়।

চিনাবাদামে প্রচুর পরিমাণে ফসফরাস থাকে, যা শরীরে অন্যান্য জলীয় উপাদান শোষণে বাধা প্রদান করে।

চিনাবাদামে এলার্জির সমস্যা হতে পারে।

চিনাবাদামে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।

পেস্তাবাদামের উপকারিতা

পেস্তাবাদামে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে।

অন্যান্য বাদামের তুলনায় পেস্তাবাদামে ক্যালরি কম থাকে। কিন্তু অ্যামিনো এসিড থাকে সর্বোচ্চ পরিমাণে যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পেস্তাবাদাম ওজন কমাতে সাহায্য করে।

পেস্তাবাদাম খাওয়ার ফলে রক্তের কোলেস্টেরল মাত্রা কমে যায়৷ ফলে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে।

পেস্তাবাদাম রক্তে চিনির মাত্রা কমায়।

পেস্তাবাদামের অপকারিতা

অতিরিক্ত পেস্তাবাদাম খাওয়ার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়।

অতিরিক্ত পেস্তাবাদাম রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।

যারা কিডনির সমস্যায় ভুগছেন তাদের পেস্তাবাদাম পরিহার করা উচিত। এছাড়া অতিরিক্ত পেস্তাবাদাম কিডনিতে পাথর সৃষ্টি করে থাকে।

পেস্তাবাদাম এলার্জির সমস্যা তৈরি করে। এছাড়া অতিরিক্ত ফাইবার থাকায় হজমেও সমস্যা তৈরি করে।

কাঁচা বাদাম খাওয়ার উপকারিতা

কাঁচা বাদাম খেলে বেশি উপকার পাওয়া যায়। বাদাম ভাজলে আগুনের তাপে উপকারী মনোআন্স্যাচুরেটেড এবং পলিআন্স্যাচুরেটেড ফ্যাট নষ্ট হয়ে যায়। আর তেলে ভাজা বাদাম খেলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তবে ১০-১৫ মিনিট নিম্ন তাপে ভোজ্য তেল ছাড়া বাদাম ভেজে খাওয়া যেতে পারে।

কাঁচা বাদাম খাওয়ার আগে ভালভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এতে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর ব্যক্টেরিয়া এবং ফাঙ্গাস থাকতে পারে। কাঁচা বাদাম সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে খেলে ত্বকের উপকার হয় এবং অধিক পুষ্টিগুণ পাওয়া যায়।

Source:
1.https://www.fastnewsfeed.com/health/disadvantages-of-cashew-nuts-everyone-should-know/
2. https://food.ndtv.com/food-drinks/7-incredible-cashew-nut-benefits-from-heart-health-to-gorgeous-hair-1415221?amp=1&akamai-rum=off#aoh=15732868142020&referrer=https%3A%2F%2Fwww.google.com&amp_tf=From%20%251%24s
3. https://m.timesofindia.com/life-style/health-fitness/photo-stories/5-surprising-side-effects-of-eating-too-many-almonds/amp_etphotostory/60747918.cms
4. https://nuts.com/healthy-eating/benefits-of-peanuts
5. https://www.livestrong.com/article/474309-side-effects-of-eating-too-many-peanuts/
6. https://www.healthline.com/nutrition/9-benefits-of-pistachios#18

আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট




Categories

টনসিলের ওষুধ | টনসিল হলে কি করবেন

টনসিলের ঔষধ

টনসিল শব্দটি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। গলায় সামান্য ব্যথা বলেই আমরা মনে করি টনসিলের সমস্যা হয়েছে। কিন্তু টনসিল আসলে কী? টনসিল আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অংশ। গলার পেছনের দিকে এবং মুখের ভেতরে মোট চারটি অংশে বিভক্ত। এই চারটি অংশের নাম হলো লিঙ্গুয়াল, প্যালাটাইন, টিউবাল ও অ্যাডেনয়েড৷

টনসিল আমাদের শরীরে ফিল্টারের মতো কাজ করে। এটি বিভিন্ন ধরনের জীবাণুকে আটকে দেয়। যেগুলো শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে ইনফেকশন তৈরি করতে পারে। এছাড়া টনসিল অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু কখনো কখনো অতিরিক্ত ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে টনসিল নিজেই ইনফেকশনের শিকার হয়। যাকে বলা হয় টনসিলাইটিস। টনসিলের চারটি অংশের যেকোনো একটিতে প্রদাহ হলে তাকে টনসিলাইটিস বলে।

টনসিল বলতে আমরা সাধারণভাবে যেটা বুঝি সেটাই টনসিলাইটিস। এটা সচরাচর শিশুদের হয়ে থাকে। তবে শিশু ছাড়াও অন্যান্য বয়সী মানুষেরও টনসিলাইটিস হতে পারে৷ টনসিলের চারটি অংশের মধ্যে প্যালাটাইন টনসিলে অধিক পরিমাণ প্রদাহ সৃষ্টি হয়। যার ফলে আমাদের গলাব্যথা হয়। প্যালাটাইন টলসিলের প্রদাহ আবার দুই রকমের হয়ে থাকে। একটি তীব্র বা অ্যাকিউট৷ আর দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক টনসিলাইটিস। 

 

টনসিলের কারণ 



ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সংক্রমণের কারণে টনসিলাইটিস বা টনসিলের সমস্যা হয়ে থাকে। তবে টনসিলের জন্য প্রধানত স্ট্রেপটোকক্কাস (স্ট্রেপ) ব্যাকটেরিয়া দায়ী৷ এছাড়া টনসিলের জন্য অন্যান্য যে সকল ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দায়ী: 

  • অ্যাডেনো ভাইরাস
  • ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস
  • এপস্টেইন-বার ভাইরাস
  • প্যারা-ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস
  • এনটারো ভাইরাস
  • হার্পস সিম্পলেক্স ভাইরাস

 

টনসিলের লক্ষণ

টনসিলাইটিসের সাধারণ লক্ষণ হলো টনসিলে জ্বালাপোড়া ও ফুলে যাওয়া৷ এছাড়াও টনসিলাইটিসের হওয়ার আগে যেসব লক্ষণ দেখা যায়: 

  • গলায় প্রচণ্ড ব্যথা
  • টনসিল লাল হওয়া
  • খাবার খেতে কষ্ট ও মুখ হাঁ করতে ব্যথা অনুভূত হওয়া
  • গলার মধ্যে তীব্র ব্যথাযুক্ত ফোস্কা বা ক্ষত সৃষ্টি হওয়া
  • মাথাব্যথা হওয়া
  • কানেও ব্যথা হতে পারে
  • শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া
  • খাবারে অরুচি
  • মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়া
  • বমিবমি ভাব হওয়া
  • পেটে ব্যথা হওয়া
  • ঢোঁক গিলতে কষ্ট হওয়া
  • স্বরভঙ্গ
  • গলা ফুলে যাওয়া

 

টনসিলের ঘরোয়া চিকিৎসা

প্রাথমিকভাবে টনসিলের সমস্যা হওয়ার পর প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে। এবং সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। এছাড়া টনসিল নিরাময়ের জন্য ঘরোয়া বেশ কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে।

১. লবণ পানি দিয়ে কুলকুচি করা

কুসুম গরম পানিতে লবণ দিয়ে কুলকুচি ও গড়গড়া করলে টনসিলের কারণে গলার ব্যথা প্রশমিত হয়৷ এছাড়া গলার মধ্যে যে জ্বালাপোড়া হয় সেটা কমাতে সাহায্য করে। একই সাথে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বন্ধ করতে সহায়তা করে। এক গ্লাস পানিতে আধা চা চামচ লবণ মিশিয়ে কয়েক সেকেন্ড করে কয়েকবার কুলকচি করতে হবে। 

২. যষ্টিমধু 

যষ্টিমধুতে প্রদাহ কমানোর উপাদান থাকায় টনসিলের জন্য এটি খুবই উপকারী। মুখের মধ্যে সামান্য যষ্টিমধু নিয়ে চিবাতে হবে। এর মাধ্যমে একই সাথে গলা ও টনসিলের প্রদাহ উপশম হয়ে থাকে৷ যদি হাতের নাগালে যষ্টিমধু না পান, তাহলে এর উপাদান সমৃদ্ধ লজেন্স কিনতে পাবেন। এই লজেন্স খেলেও টনসিলের সমস্যায় উপকার পাওয়া যায়৷ তবে কেনার সময় অবশ্যই ভালো মানের লজেন্স কিনতে হবে। বাচ্চাদের টনসিলের সমস্যা হলে এই লজেন্স খেতে দেওয়া যাবে না। কেননা গলায় আটকে যেতে পারে। এর পরিবর্তে টনসিলের জন্য ‘থ্রোট (গলা) স্পে’ ব্যবহার করতে পারেন।

৩. মধু দিয়ে চা

চা অথবা অন্য কোনো গরম পানীয় টনসিলের কারণে গলায় সৃষ্ট হওয়া অস্বস্তি দূর করতে সাহায্য করে। চায়ের সাথে মধু যোগ করলে আরো বেশি উপকার পাওয়া যায়। কেননা মধুতে রয়েছে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী উপাদান। যার ফলে ব্যাকটেরিয়ার কারণে টনসিলাইটিস সংক্রমণ হলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। 

গরম চায়ের সাথে মধু মিশিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে৷ মধু যখন চায়ের সাথে মিশে যাবে তখন পানির মতো চুমুক দিয়ে খেতে হবে। এছাড়া টনসিল নিরাময়ের জন্য আদা চা ও পুদিনা পাতার চা বেশ কার্যকরী। 

৪. ঠাণ্ডা জাতীয় খাবার

ফ্রিজে রাখা দই অথবা আইসক্রিমের মতো ঠাণ্ডা ও নরম খাবার খেলে সাময়িকভাবে টনসিলের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কেননা এই জাতীয় খাবার গলার মধ্যে ব্যথার অনুভূতিকে অসাড় করে দেয়৷ এর জন্য অনেকে আইস পপ, ঠাণ্ডা পানীয় ও ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি খেয়ে থাকেন। একই ধরনের ফল পাওয়ার জন্য চাইলে মিন্ট (পুদিনা) বা মেনথল যুক্ত চুইংগাম বা লজেন্স খেতে পারেন। 

৫. পর্যাপ্ত বিশ্রাম

টনসিলাইটিস হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। কেননা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের সাথে লড়াই করতে হলে পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। এই রোগকে হালকাভাবে না নিয়ে সুস্থ মানুষের মতো স্কুল, কলেজ বা অফিসে যাওয়া উচিত নয়। কয়েকদিনের পূর্ণ বিশ্রাম না নিয়ে অন্য সময়ের মতো কাজ করলে টনসিলাইটিস বেড়ে যেতে পারে। একই সাথে আশেপাশে থাকা অন্য মানুষজন এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। 

 

টনসিল হলে যা খাবেন 

মধু: টনসিলের সমস্যায় মধু খু্বই কার্যকরী। বিশেষ করে টনসিলের সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং রাতে ভালো ঘুমের জন্য মধু খুবই উপকারী। এছাড়া মধু কফের ঔষুধ হিসেবে কাজ করে। টনসিলে আক্রান্ত হলে চা অথবা গরম লেবু পানির সাথে মধু পান করলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যায়।

কলা: কলা পুষ্টিকর, নরম এবং সহজে গেলা যায়। টনসিলে আক্রান্ত রোগীর যেহেতু শক্ত খাবার খাওয়া নিষেধ। সেজন্য কলার সাথে আরো কিছু নরম ফলমূল মিশিয়ে খেলে টনসিলের উপর চাপ কম পড়বে। একই সাথে ক্ষুধা নিবারণ করা সম্ভব। 

সুপ: টনসিলের রোগীদের জন্য গরম সুপ উত্তম খাবার। সুপের মধ্যে শস্য দানার ভাত, গাজর, শিম বা অন্য কোনো সবজি কুচিকুচি করে কেটে সেদ্ধ করে সুপের সাথে মিশিয়ে খেলে শরীরের পুষ্টির চাহিদা মিটবে। এছাড়া টনসিল থেকে অল্প সময়ে আরোগ্য লাভ করার জন্যও সুপ কার্যকরী।

নরম পাস্তা: কলার মতো পাস্তা সহজে গেলা যায়। তাই টনসিল হলে ক্ষুধা নিবারণের জন্য ভাতের পরিবর্তে নরম পাস্তা খাওয়া ভালো। চাইলে সুপের সাথে পাস্তা মিশিয়ে খেতে পারেন। 

ডিম ভর্তা: ডিম সেদ্ধ করে পেঁয়াজ, মরিচ ছাড়া ছাড়া ভর্তার মতো করে আলুর সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। কেননা এই খাবারটি টনসিলে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। কিন্তু শরীরে শক্তি যোগাতে ডিম ও আলু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 



 

টনসিল হলে যা খাবেন না

টমেটো সস: টমেটো দিয়ে তৈরি টমেটো কেচাপ কিংবা পিৎজা সস খেলে টনসিলের সমস্যা আরো বাড়তে পারে। কারণ টমেটো সস জাতীয় খাবার খুবই এসিডিক। তাই টনসিলের রোগীদের এই খাবার এড়িয়ে চলাই উত্তম। 

মসলাদার খাবার: টমেটো সসের মতোই মরিচ কিংবা রসুন যুক্ত যেকোনো খাবার টনসিলের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। এই মসলাগুলো গলার মধ্যে অস্বস্তিকর কাশি ও কফের সৃষ্টি করে গলার ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এসব মসলাদার খাবার টনসিলের সমস্যা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বাদ রাখতে হবে। 

শক্ত খাবার: হালকা নাস্তায় পপকর্ন, আলুর চিপস কিংবা ক্র্যাকার্স বাদ দিতে হবে। এই খাবারগুলো টনসিলের সমস্যাকে দীর্ঘমেয়াদী করে তুলতে পারে। সেই সাথে গলায় ব্যথা বাড়াতে পারে। 

টক ফল: কমলা বা মাল্টার মতো অন্যান্য টক স্বাদযুক্ত ফলে এসিড থাকে, যা গলার প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়। তাই এই খাবারগুলো না খাওয়াই উত্তম। এমনকি এসব ফলের রস খাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।

টোস্ট বিস্কুট: মচমচে টোস্ট বিস্কুট খাওয়ার পরিবর্তে নরম পাউরুটি খেতে হবে। চাইলে রুটি দুধে ভিজিয়ে খেতে পারেন। টনসিলের আক্রান্ত রোগীদের কফি ও মদ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এই দুটি পানীয় টনসিলের জন্য ক্ষতিকর। এসব পানীয় পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে। 

 

টনসিলের চিকিৎসা

টনসিলের চিকিৎসার শুরুতে সাধারণত ব্যথানাশক ঔষধ দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে যদি টনসিলের সমস্যা হয় তাহলে চিকিৎসকরা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। অবশ্যই এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেতে হবে। টনসিলের সমস্যা ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও। কেননা অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার পর কোর্স শেষ না করলে পরবর্তীতে আবারো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি কিডনির সমস্যাও হতে পারে।

আগে টনসিলের সমস্যায় অস্ত্রোপচার করা নিয়মিত ঘটনা ছিল। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসারা পরিস্থিতি বুঝে টনসিলের অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে একজন মানুষ যদি বছরে ৭ বার অথবা বছরে ৩ বার করে টানা ৩ বছর টনসিলের সমস্যায় আক্রান্ত হন তাহলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন৷ কিন্তু টনসিল যেহেতু আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই অপ্রয়োজনে অস্ত্রোপচার করে ফেলে দেওয়া উচিত নয়।

যদি অস্ত্রোপচার ছাড়া আর কোনো সমাধান না থাকে তাহলে ভালো কোনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম। বর্তমানে টনসিলের অপারেশনের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। তার মধ্যে থেকে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি বেছে নেওয়া ভালো৷ টনসিলের সমস্যায় অস্ত্রোপচার শেষ চিকিৎসা। সাধারণত এই সমস্যায় অস্ত্রোপচার করার হার খুবই কম। তাই টনসিল হলে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

 

টনসিল প্রতিরোধ

টনসিলেল সমস্যা থেকে দূরে থাকার জন্য এর প্রতিরোধ করতে হবে। টনসিল প্রতিরোধ করার জন্য দিনে কয়েকবার হাত পরিষ্কার করতে হবে। নিজের খাবার, পানীয় বা অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্রকে অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত না। এছাড়া যারা টনসিলের সময় ভুগছেন তাদের থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।

Source:

https://www.healthline.com/health/home-remedies-for-tonsilitis#warm-tea-and-honeyhttps://www.webmd.com/oral-health/tonsillitis-symptoms-causes-and-treatments#1https://www.everydayhealth.com/tonsillitis/home-remedies-fast-recovery/

আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট




Categories

ঘুম কমানোর উপায়

ঘুম কমানোর উপায়

আমাদের সংক্ষিপ্ত জীবনে সময়ের হিসাব মেলানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন  সময়ের সদ্ব্যবহার করলেই জীবনে সফলতা অর্জন করা সম্ভব৷ কিন্তু আমরা অনেকেই দিন-রাত্রির বড় একটি সময় বিছানায় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেই। কেউ কাজের প্রতি অনীহা করে  ঘুমান, আবার কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে।

চিকিৎসকদের ভাষায় একজন মানুষের সুস্থ থাকার জন্য ৮ ঘণ্টার ঘুমই যথেষ্ট। কোনো কোনো চিকিৎসকের মতে আবার সেটি ৮ ঘণ্টারও কম। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন শুধুমাত্র রাতেই ৮ ঘণ্টার বেশি ঘুমান। পাশাপাশি অনেকের দিনে ঘুমানোর অভ্যাস রয়েছে। অতিরিক্ত ঘুমের কারণে দিনের বড় একটি সময় নষ্ট হয়। অথচ এই সময়ে আমরা অনেক প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারি। পরিমিত ঘুমের পর বাকি সময়ের সদ্ব্যবহার আমাদের সাফল্য পেতে সহায়ক হতে পারে। সুস্থ ডট কমের আজকের লেখাটি ঘুম কমানোর উপায় সমূহ নিয়ে সাজানো হয়েছে।

অতিরিক্ত ঘুমের কারণ

সাধারণত রাতে অপর্যাপ্ত ঘুম, ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তন এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো বিভিন্ন স্লিপিং ডিসঅর্ডারের কারণে দিনে অতিরিক্ত ঘুম হয়। সপ্তাহ কিংবা মাসের মধ্যে তিন থেকে চারদিন এমন ঘটলে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া যায়৷ তবে কেউ যদি নিয়মিতভাবে দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুমায় তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কেননা ব্রেন এবং দেহের বিভিন্ন অবস্থার পরিপেক্ষিতেও অতিরিক্ত ঘুমানোন প্রবণতা দেখা যায়৷ পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন ঘটনার জন্য অতিরিক্ত ঘুম হয়৷ যেমন, কোনো শব্দ বা অন্য কোনো কারণে যদি রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে তাহলে দিনে ঘুম বেশি হয়। আবার পার্কিনসনের মতো স্নায়ুতন্ত্রের রোগের কারণেও অতিরিক্ত ঘুম হয়। এর বাইরে যারা সাইকিয়াট্রিক ডিসঅর্ডারের কারণে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতায় ভোগেন তাদের মধ্যে কারো ঘুম খুব বেশি হয়, আবার কারো খুবই কম হয়।

অতিরিক্ত ঘুম শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ও কাজের জন্য ক্ষতিকর নয়। পাশাপাশি এটি হতে পারে অন্য কোনো রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। চিকিৎসকদের মতে যারা হটাৎ করে অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যায় ভোগেন তাদের অনেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন ইনফেকশন, অ্যাজমা, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ডিসঅর্ডার ও মেটাবলিক অ্যাবনরমালাইটিজে আক্রান্ত হন। প্রাথমিক অবস্থায় এই বিষয়টি অনেকে বুঝতে পারেন না। আবার যারা বুঝতে পারেন তারা কোনো গুরুত্ব দেন না। ভালো ঘুম অফিস কিংবা স্কুল কলেজে, পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সাথে ভালো সময় কাটাতে সাহায্য করে। বিপরীতে অতিরিক্ত তন্দ্রা কাজের ক্ষতির পাশাপাশি বড় জটিল কোনো রোগের দিকে নিয়ে যায়। তাই নিয়মিত অতিরিক্ত তন্দ্রাভাব হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি খাবারদাবার, লাইফস্টাইল ও অভ্যাসে পরিবর্তন আনা আবশ্যক৷ 



দিনে কম ঘুমানোর উপায়

প্রায় সবারই দিনের বিশেষ কিছু সময়ে ঘুম ঘুম ভাব হয়। তবে কেউ কেউ দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। কখনো কাজের সময় অথবা অবসর সময়েও এই সমস্যায় ভুগতে হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যার নাম হলো হাইপারসোমনিয়া। দিনের বেলা এই সমস্যা হলেও এর শুরু হয় রাতে। মূলত রাতের বেলা অপর্যাপ্ত ঘুম অথবা অনিয়মিত ঘুমের কারণেই দিনে অতিরিক্ত ঘুমের ভাব হয়। এই সমস্যা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারেন সে সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

১. রাতে পর্যাপ্ত ঘুমঃ দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম হওয়ার প্রধান কারণ হলো রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া। অনেকেই রাতে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। এমনকি ভোরের দিকে ঘুমাতে যান। যে কারণে দিনে ঘুমের ভাব হয়। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। অল্প বয়সী ছেলে মেয়েদের পুরো নয় ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। তবে গড়ে সবারই রাতে কমপক্ষে আট ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। 

২. বিছানা থেকে দূরত্ব তৈরিঃ ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক অ্যাভেলিনো ভার্সেলেস বলেছেন, “বিছানাকে শুধুমাত্র ঘুমানো ও যৌন মিলনের জন্য ব্যবহার করুন। বিছানায় বসে কিংবা শুয়ে পড়াশোনা, টিভি দেখা, গেমস খেলা ও ল্যাপটপ ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকুন।” এছাড়া বিছানায় কোনো হিসাব-নিকাশ ও কারো সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় থেকে দূরে থাকতে হবে। 

৩. নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠাঃ যারা ঘুমের সমস্যায় ভোগেন তাদের প্রায়ই ঘুমানো ও ঘুম থেকে উঠার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করার কথা বলা হয়৷ এমনকি সপ্তাহের শেষ দিনেও এই নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু যারা ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রায় ভুগছেন তারা নির্দিষ্ট ঘুমানোর সময় নির্ধারণ করে আরো বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। এ কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠার উপর জোর দিতে বলেছেন। সেটা হতে পারে এক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস। 

৪. তাড়াতাড়ি ঘুমানোর উপর জোর দেওয়াঃ হটাৎ করে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা না করে ধারাবাহিকভাবে অল্প অল্প করে সময় কমিয়ে আনা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতি চার রাত পরপর আগের চেয়ে ১৫ মিনিট আগে ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। এরপর একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। 

৫. নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার অভ্যাসঃ নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সকাল ও দুপুরের খাবার খেতে হবে। রাতের খাবার খেতে হবে ঘুমানোর দুই থেকে তিন ঘণ্টা পূর্বে। 

৬. ব্যায়ামঃ ভালো ঘুমের জন্য ব্যায়াম বিভিন্নভাবে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে অ্যারোবিক এক্সারসাইজ রাতে ভালো ঘুম হতে সহায়তা করে। পাশাপাশি দিনে কাজ করার জন্য এনার্জি প্রদান করে এবং বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেকের দিনের আলোতে কমপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা উচিত। 

৭. সময়সূচি তৈরিঃ যদি আপনাকে রাতে বিভিন্ন ধরনের কাজ সামলাতে গিয়ে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে সমস্যা হয়, তাহলে একটি সময়সূচি তৈরি করুন। বিভিন্ন কাজের গুরুত্ব নির্ধারণ করুন। রাতে অপ্রয়োজনীয় কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। এতে আপনি ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবেন। পাশাপাশি আপনাকে অহেতুক কাজের চাপে পড়তে হবে না।

৮. ঘুম না আসা পর্যন্ত বিছানায় না যাওয়াঃ কখনো ক্লান্ত হলেই বিছানায় গা এলিয়ে দেবেন না। এতে আপনার ভালো ঘুম হবে না। যখন ঘুমের ভাব হবে তখনই বিছানায় যাওয়া উচিত। তাই সবার আগে নিজের ক্লান্তি ও ঘুমের মধ্যে ফারাক বোঝার চেষ্টা করুন। 

৯. বিকালে না ঘুমানোঃ বিকালের ঘুম রাতের ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। যার ফলে দিনে কাজের সময় ঘুমের ভাব হয়। তাই বিকালেই না ঘুমানোই ভালো। 

১০. ঘুমানোর আগে চিত্তবিনোদন (Relaxing): ঘুমানোর আগে বিশেষ কিছু চিত্তবিনোদন দিনের সকল ক্লান্তি দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। চিত্তবিনোদনের জন্যে গান শুনতে পারেন, বই পড়তে পারেন, হট বাথ করতে পারেন অথবা মেডিটেশন করতে পারেন। পাশাপাশি এক কাপ হারবাল চা অথবা গরম দুধ পান করতে পারেন। তবে যেসব খাবার খেলে রাতে বারবার ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, সে সকল খাবার পরিহার করতে হবে। 

১১. অ্যালকোহল পরিহারঃ অনেকে মনে করেন মদ বা অ্যালকোহল জাতীয় কোনো খাবার রাতে ঘুমানোর জন্য সহায়তা করে। কিন্তু এটি পুরোপুরি ভুল। বরং অ্যালকোহলের কারণে অনিদ্রা হয়। যার প্রভাব পড়ে দিনের কাজকর্মে। 

১২. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণঃ স্লিপিং ডিসঅর্ডারের কারণে দিনে অতিরিক্ত ঘুম হতে পারে। যদি কোনোভাবে দিনে বেলায় অতিরিক্ত ঘুমের সমস্যা দূর না করা যায় তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম। 

 

ঘুম কমানোর খাবার

গ্রিন টিঃ শরীরে পানিশূন্যতা হলে ঘুম পায়। কিন্তু বিশেষ কিছু তরল খাবার পানিশূন্যতা কমানোর পাশাপাশি জেগে থাকতে সহায়তা করে। এ জন্য পানি উত্তম তরল খাবার। তবে এর সাথে ক্যাফেইন থাকলে ঘুম দূর করা যায়। এক্ষেত্রে কফির চেয়ে গ্রিন টি বেশি উপকারী৷ কেননা কফি অপেক্ষা গ্রিনটিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ অনেক কম। সাথে শরীরের জন্য উপকারী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টও পাওয়া যায়।

চকোলেটঃ চকোলেট তৈরির প্রধান উপকরণ চকোয়া বিনে মনকে উৎফুল্ল ও সজাগ করার উপাদান থাকে। তবে কফি অপেক্ষা কম। বোনাস হিসেবে চকোলেটে হার্টের জন্য উপকারী ফ্লাভোনয়েড। তবে মনে রাখতে হবে, চকোলেট যত ডার্ক হবে, ক্যাফেইনের মাত্রাও তত বেশি। তাই অতিরিক্ত মাত্রায় ডার্ক চকোলেট না খাওয়াই উত্তম। 

শস্যদানাঃ আমাদের শরীর কার্বোহাইড্রেট থেকে এনার্জি যোগায়। শস্যদানা থেকে মূলত কার্বোহাইড্রেট। যেমন, চাল, গম, বার্লি, ওটস, রাই ইত্যাদি। শস্যদানা খুব ধীরে ধীরে ভাঙে। এর ফলে শরীরে ধারাবাহিকভাবে শক্তি যোগাতে পারে। শরীর শক্তি থাকলে ক্লান্ত হবার সম্ভাবনা কম। মূলত ক্লান্তি থেকেই ঘুম আসে। ঘুম কমানোর জন্য পরিমিত ভাত, রুটি অথবা টোস্ট খাওয়া যেতে পারে। যেহেতু আমাদের প্রধান খাবার ভাত। তাই শস্যদানা থেকে অন্য কোনো খাবার খাওয়া খেতে পারেন।

ফলমূলঃ  ফলে থাকা সুগার আমাদের শরীরে দ্রুত এনার্জি যোগায়। কিন্তু ফল খেলে শরীরের গ্লুকোজ লেভেল খুব বেশি বাড়ে না। তাই এনার্জি পাওয়ার জন্য ফল খাওয়া নিরাপদ। বিশেষ ভিটামিন -সি সমৃদ্ধ কমলা অথবা আনারস খেতে পারেন। এই ফলগুলো শরীরের চর্বিকে গলিয়ে এনার্জিতে রূপান্তিত করে। 

প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারঃ প্রোটিন থেকে এনার্জি খুব ধীরে ধীরে পাওয়া যায়। ফলে শরীরে দীর্ঘ সময় এনার্জি পাওয়া যায়। তবে মাংস খুবই কম খাওয়া উচিত। এছাড়া খাওয়ার আগে কিছু সময় ব্যায়াম করা যেতে পারে। এতে করে ক্ষুধা বাড়ে। 



ঘুম কমানোর আমল

ঘুম কমানোর দোয়াটি ইবনে আবি শাইবাতে আছে—– ﺍَﻟﻠّﻬُﻢَّ ﺍﺷْﻔِﻨِﻲْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﻮْﻡِ ﺑِﻴَﺴِﻴْﺮٍ، ﻭَﺍﺭْﺯُﻗْﻨِﻲْ ﺳَﻬَﺮًﺍ ﻓِﻲْ ﻃَﺎﻋَﺘِﻚَ . ( 302/15 ) বাংলা উচ্চারণঃ ( মোটামুটি) আল্লাহুম্মাশফিনী মিনান নাওমি বিইয়াসীর, ওয়ারযুক্বনী সাহারন ফী ত্ব~য়াতিক অর্থঃ ‘ইয়া আল্লাহ, সামান্য ঘুম দ্বারাই আমার প্রয়োজন পূরণ করুন এবং আপনার আদেশ পালনে রাত্রিজাগরণের তাওফীক দিন।’

আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
আমার ওজন কমানোর গল্প

আমার ৩৪ কেজি ওজন কামানোর কথা

home remedies for insomnia

অনিদ্রা দূর করার উপায় । ১০ টি ঘরোয়া ঔষধ

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আঁচিলের প্রাকৃতিক চিকিৎসা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা

আমার ওজন কমানোর খাবার তালিকা বা ডায়েট চার্ট

অতিরিক্ত ওজন কমানোর ঔষধ

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ঔষধ

ওজন বাড়ানোর খাবার তালিকা

কফ কাশির প্রাকৃতিক ঔষধ

কফ বা কাশির প্রাকৃতিক চিকিৎসা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়

কোষ্টকাঠিন্য থেকে মুক্তির উপায়

গরম পানি খাওয়ার উপকারিতা

গরম পানি খাওয়ার ১০ টি উপকারিতা

খুশকি দূর করার উপায়

ঘরে বসে খুশকি দূর করার সহজ ১০টি উপায় । খুশকি দূর করার প্রাকৃতিক শ্যাম্পু

চুল পরা বন্ধের উপায়

চুল পড়া বন্ধের প্রাকৃতিক ঔষধ 

দ্রুত ওজন বাড়ানোর উপায়

দ্রুত ওজন বারানোর উপায়

বমি দূর করার উপায়

বমি দূর করার উপায় | বমি হলে করনীয়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর উপায়

ব্যায়াম ছাড়া ওজন কমানোর ৯ টি সহজ উপায়

দ্রুত ওজন কমানোর খাবার তালিকা

মাসে ১০ কেজি ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট

Categories