হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ। খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই রোগটি অনেক সময় গুরুতর হয়ে উঠে। টিকা থাকার পরও পৃথিবীর অনেক দেশে এখনও হাম একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা।

হাম কি?
হাম ভাইরাসের কারণে হওয়া অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃশ্বাস, হাঁচি, কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই ছড়ায়। এটি এমন প্রাণঘাতী রোগ যা থেকে নানারকম জটিলতা যেমন- তিব্র মাথা ব্যথা, নিউমোনিয়া, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। হাম সবারই হতে পারে, তবে বাচ্চাদের হবার সম্ভাবনা বেশি।
প্রথমে শ্বাসনালীতে ভাইরাসের আক্রমণ হয়, এরপর রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়ায়। এতে প্রচণ্ড জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, মুখের ভেতরে সাদা দাগ এবং সারা শরীরে লালচে র্যাশ দেখা যায়।
হাম প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ করাই সবচেয়ে ভাল উপায়। ১৯৬৩ সালের সর্বপ্রথম হামের টিকা আবিষ্কার হয়। এর আগে প্রত্যেক ২-৩ বছর পরপর হাম মহামারি আকার ধারণ করত। তখন প্রতিবছর প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষ শুধু হাম হয়ে মারা যেত।
২০২৪ সালেও হামের কারণে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। মৃতদের বেশিরভাগই ছিল ৫ বছরের কম বয়সী। হামের টিকা নিরাপদ ও কম খরচ হওয়া সত্ত্বেও বহু মানুষ এখনও এতে আক্রান্ত হয়।
হাম কেন হয়?
আক্রান্ত ব্যাক্তির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে হাম হয়। এটি ভাইরাসজনিত রোগ এবং মানুষের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কথা বলার সময় হাঁচি বা কাশি হলে হামের জীবাণুবাহী ছোট ছোট জলকণা বাতাসে ছড়িয়ে পরে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে কেউ তা গ্রহণ করলে এটি শরীরে প্রবেশ করে। ফলে সে হামে আক্রান্ত হয়।
ভাইরাসযুক্ত জলকণা বাতাসে বা কোন কিছুর পৃষ্ঠে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ফলে সংক্রমন হবার ঝুঁকি বেশি থাকে।
হাম রোগের লক্ষণ কি?
সংক্রমণের ৭-১৪ দিনের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যায়। হামের প্রধান লক্ষণ গুলো হলঃ
- প্রচণ্ড জ্বর
- গলা ব্যাথা
- শুকনা কাশি
- সর্দি ও কাশি
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- শরীরে লাল ফুসকুড়ি
- চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া
- আলোতে চোখে কষ্ট হওয়া
- মুখের ভিতর সাদা ছোট ছোট দাগ
- ক্লান্তি অনুভব হওয়া
- হজমে বা পেটের সমস্যা যেমন- ডায়রিয়া, বমি, পেটে ব্যাথা ইত্যাদি।
হাম রোগের উপসর্গ
হামের উপসর্গ ধাপে ধাপে বাড়েঃ
- প্রথম দিকে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়।
- এরপর মুখের ভিতরে সাদা দাগ দেখা যায়। জ্বর আরও বেড়ে যায়।
- তারপর র্যাশ শুরু হয় ও তা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
- শেষের দিকে, র্যাশ কমতে থাকে, এবং মৃত চামড়া ঝরে পরে ত্বক স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
হামের জটিলতা
হামের কারণে নানা ধরণের জটিলতা হতে পারে। সাধারণত এই জটিল রোগগুলোর কারণেই মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হয়। সেগুলো হলঃ
- নিউমোনিয়া
- শ্বাসকষ্ট
- কানের ইনফেকশন
- পানিশূন্যতা
- মস্তিষ্কের রোগ (Encephalitis)
- ডায়রিয়া ও বমি
- গর্ভাবস্থায় জটিলতা যেমন- সময়ের আগে জন্মদান, বাচ্চার ওজন কমে যাওয়া, গর্ভের সন্তানের মৃত্যু।
কারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে?
- যারা টিকা নেয়নি
- ৫বছরের চেয়ে ছোট শিশু
- গর্ভবতী নারী
- অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
- যাদের ভিটামিন- এ এর অভাব আছে
- যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
- HIV বা অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তি

হাম হলে করণীয় কি?
হাম হলে সঠিক যত্ন নেওয়া জরুরী-
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া
- প্রচুর পানি ও তরল খাবার খাওয়া
- জ্বর ও ব্যাথা কমানোর জন্য ডাক্তারের পরামর্শে প্যারাসিটামল খাওয়া
- চোখের যত্ন নেওয়া
- পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
- আলাদা ঘরে বা আইসোলেশনে থাকা
হামের জরুরি টিকাদান
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল থেকে এক মাস ব্যাপী ১৮ টি জেলার ৩০ টি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের ১২ লক্ষের বেশি শিশুকে জরুরিভাবে হাম – রুবেলার টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তাই বিনামূল্যেে এ টিকা প্রদান করা হচ্ছে।
হামের টিকা কখন দিতে হয়?
হামের টিকা সাধারণত সরাসরি বা মাম্পস, রুবেলা অথবা ভ্যারিসেলা টিকার সাথে একত্রে দেওয়া হয়।
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য টিকার দুটি ডোজই নেওয়া উচিত। যেসব দেশে হামের প্রকোপ বেশি, সেখানে সাধারণত ৯ মাস বয়সে টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। অন্যান্য দেশে ১২-১৫ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ডোজটি শৈশবের পরবর্তী পর্যায়ে, সাধারণত ১৫-১৮ মাস বয়সে দেওয়া হয়।
FAQs
- হাম হলে কি খেতে হবে না?
হাম হলে প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত ঝা্ল-মশলা, চর্বিযুক্ত খাবার, ভাজা পোড়া, অতিরক্ত চা বা কফি ইত্যদি খাবার বাদ দিতে হবে। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকায়, এসব খাবার হজমে সমস্যা তৈরি করে।
- হাম সারতে কতদিন লাগে?
হাম সাধারণত ৭–১০ দিনের মধ্যে কমে যায়। পুরো র্যাশ ও জ্বর ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে বিভিন্ন জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া বা এনসেফালাইটিসের ক্ষেত্রে বেশি সময় লাগতে পারে।
- হাম কি কাপড়ে ছড়ায়?
হ্যাঁ, হাম ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির নাক-মুখ থেকে আসা জলকণার মাধ্যমে কাপড়ে জীবাণু লাগতে পারে। কেউ সেই কাপড় স্পর্শ করলে ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।
- হাম হলে কি কলা খাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, কলার উপকারিতা আছে তাই এটি খাওয়া নিরাপদ। কলা যেহেতু পুষ্টিকর খাবার তাই এটি অসুস্থ শরীরে শক্তি যোগায় । হালকা খাবার, ফল ও স্যুপ খাওয়া ভালো।
- হাম হলে কি মাস্ক পরা উচিত?
হ্যাঁ, সংক্রমণ কমাতে সবারই মাস্ক পরা উচিত। এটি অন্যদের থেকে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়। এছাড়াও সুস্থ ও আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখলে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
- হাম হলে কি গোসল করা যায়?
হ্যাঁ, হাম হলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার জন্য নিয়মিত গোসল করানো উচিৎ। তবে ঠাণ্ডা পানির বদলে কুসুম গরম পানি ব্যাবহার করা ভালো। তাতে রোগী আরামবোধ করেন।
- হাম ও রুবেলা কি একই?
হাম হয় Rubeola ভাইরাস থেকে আর রুবেলা হয় Rubella দ্বারা। এই দুই রোগের লক্ষণ দেখতে কিছুটা একই রকম হলেও আসলে দুইটি আলাদা ভাইরাসজনিত রোগ। হাম সাধারণত বেশি গুরুতর কিন্তু রুবেলা কিছুটা কম বিপদজনক। তবে রুবেলা গর্ভবতী নারীর জন্য মারাত্মক হতে পারে। কারণ এতে গর্ভের শিশুর জন্মগত ত্রুটি হবার সম্ভাবনা থাকে।
- হাম রোগটি সাধারণত শিশুদের কত বছর বয়সে হয়ে থাকে?
হাম সাধারণত ১–৫ বছরের শিশুদের বেশি হয়। তবে টিকা না নিলে বড়রাও আক্রান্ত হতে পারে।
- হাম দ্রুত দূর করার উপায়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক্ষণগুলোর যত্ন নেওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল ও পুষ্টিকর খাবার দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
- হামের ঔষধ কি?
হামকে নিরাময় করতে সরাসরি কোনো অ্যান্টিভাইরাস নেই। MMR টিকা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। রোগের উপসর্গ কমানো, জ্বর নিয়ন্ত্রণ, পানির অভাব পূরন, সাথে জটিলতা প্রতিরোধ করাই মূল লক্ষ্য।
- হাম হলে কি চুলকায়?
হামের ফুসকুড়িতে সাধারণত চুলকায় না। তবে ব্যাক্তিভেদে সামান্য চুলকানি হতেও পারে।
- হাম কত প্রকার?
হামের কোন প্রকারভেদ নেই। তবে শারীরিক অবস্থা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনুযায়ী কম বা বেশি গুরুতর হতে পারে।
- লেবু পানি কি হামের জন্য ভালো?
লেবুর রস ভিটামিন সি এর উৎস। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে, হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে পান ভালো।
- টিকা ছাড়া কি হাম নিরাময় সম্ভব?
হ্যাঁ, তবে ঝুঁকি অনেক বেশি। টিকা ছাড়া সংক্রমণ হলে জটিলতা ও মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশি থাকে।
- এন্টিবায়োটিক কি হামের চিকিৎসা করতে পারে?
না, হাম ভাইরাসজনিত, এন্টিবায়োটিক এতে কার্যকরী নয়। তবে সংক্রমণের কারণে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াল রোগ হলে চিকিৎসক এন্টিবায়োটিক দিতে পারেন।
- হাম হয়েছে কিনা কিভাবে বুঝবো?
অনেক বেশি জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল, মুখের ভিতরে সাদা দাগ এবং পরে লাল র্যাশ থাকলে বুঝতে হবে হাম হয়েছে।
- হাম রোগে মৃত্যুর হার কত?
বিশ্বে হামে মৃত্যুর হার আগে ছিল ১০ লক্ষে ১ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ হয়েছে।
- হাম হলে কি শরীর ব্যথা হয়?
সাধারণত সবারই হালকা মাংসপেশি ব্যথা এবং শারীরিক দুর্বলতা হয়।
- ৩ দিনের হাম রোগকে কি বলে?
৩ দিনের হাম বলতে আসলে কোন রোগ নেই। অনেক সময় সমস্যা কম থাকলে ২-৩ দিনে সেরে যেতে পারে।
- খেসরা রোগ কি?
খেসরা হলো হামের অপর একটি নাম।
- টিগডাস এবং হাম কি একই?
হ্যাঁ, টিগডাস এবং হাম একই রোগ। ফিলিপাইন বা অন্য কিছু দেশের ভাষায় আঞ্চলিকভাবে হামকে টিগডাস বলা হয়।
- হাম রোগের প্রভাব কি?
হাম শ্বাসনালী ও দেহের অন্যান্য অঙ্গের উপর প্রভাব ফেলে। নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, চোখে সমস্যা, এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে।
Sources:
https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/measles/symptoms-causes/syc-20374857
https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/measles
https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/8584-measles
