হাত পা ঘামার প্রাকৃতিক চিকিৎসা

অতিরিক্ত হাত পা ঘামা অন্যান্য রোগের মতই একটি রোগ এবং অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত। হাত ঘামার কারণে অন্যের সাথে হাত মেলাতে বা হ্যান্ডশেক করতে ভয় লাগে। পা ঘামার কারণে সবার সামনে মোজা খুলতে ভয় পান। কেননা বিকট দুর্গন্ধে সবাই আপনার দিকে ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকাবে। কেউ কেউ আবার হাসাহাসি করবে। হাত পা ঘামার সমাধান খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়েছেন। তাহলে এখনি নিচের হাত পা ঘামার ঔষধগুলো ব্যবহার করা শুরু করুন।

হাত পা ঘামার ঔষধ

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে হাইপারহাইড্রোসিস (Hyperhidrosis) নামে পরিচিত। এই রোগের ফলে শরীরের অনেক অঙ্গই ঘামতে পারে। তবে স্বাভাবিকভাবে হাত-পায়ের তালু, বগল এবং মুখে এর লক্ষণ বেশি দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বংশীয় কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। স্নায়ুর অতিরিক্ত কার্যক্রমের ফলে লালাগ্রন্থি উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত মাত্রায় হাত পা ঘামে। অনেক সময় নির্দিষ্ট ঔষধ সেবন, মাসিক জনিত সমস্যা, অতিরিক্ত মোটা, রক্তে চিনি কমে যাওয়া, হার্ট এট্যাক এবং সংক্রামক জাতীয় রোগের কারণেও এ রোগ হতে পারে।

হাত ঘামার ঔষধ

হাত ঘামার প্রতিকার হিসেবে নিচের প্রাকৃতিক এবং ঘরোয়া ঔষধগুলো নিয়মিত ব্যবহার করলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।



১। বেকিং সোডাঃ ক্ষারধর্মী উপদান থাকার কারনলে বেকিং সোডা হাত পায়ের ঘাম প্রতিকারে অনেক কার্যকরী। ৩ টেবিল চামচ বেকিং সোডা গরম পানির সাথে মেশান। ৩০ মিনিট সেই পানিতে হাত পা ভিজিয়ে রাখুন এবং সে অবস্থায় ভাল করে ঘষুন। এরপর শুকনা কাপড় দিয়ে হাত পা মুছে ফেলুন।

২। আপেল সিডার ভিনেগারঃ

সিরকা বা আপেল সিডার ভিনেগার হাত-পা ঘামার ঔষধ হিসেবে অনেক ফলপ্রসূ। এতে এস্ট্রিনজেন্ট নামক একধরনের পদার্থ আছে যা লোমকূপকে সঙ্কুচিত করে অতিরিক্ত ঘামাকে নিয়ন্ত্রণ করে। হালকা গরম পানি দিয়ে ঘর্মাক্ত স্থানগুলো ভিজিয়ে নিন। তারপর কটন বলের সাথে কিছু ভিনেগার লাগিয়ে নিন। সারারাত এভাবে রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্থানগুলো ধুয়ে ফেলুন এবং সেখানে বেবি পাউডার লাগান। অথবা ভিনেগারের সাথে গোলাপজল মিশিয়ে দিনে দুই তিনবার লাগাতে পারেন। ভিনেগারের সাথে মধু মিশিয়েও লাগানো যাবে।

৩। ভুট্টার আটাঃ হাত পা ঘামার প্রতিকারে ভুট্টার আটা আরেকটি কার্যকরী ঔষধ। এটা হাইপারহাইড্রোসিসের প্রভাব কমিয়ে ত্বকের আর্দ্রতা শুষে নেয়। আর এটা ঘুব সহজে এবং অল্প টাকায় সব জাগায় পাওয়া যায়। সমপরিমাণ ভুট্টার আটার সাথে বেকিং সোডা মিশিয়ে ট্যালকম পাউডারের বোটলে ভরে রাখুন। টিস্যু দিয়ে অতিরিক্ত ঘর্মাক্ত জায়গাগুলো পরিষ্কার করুন এবং সেখানে পাঊডারের মত করে ব্যবহার করুন।

৪। লেবুর রসঃ লেবুর রসে প্রাকৃতিক ডিউডরান্ট বা গন্ধনাশক আছে যা, হাত ঘামার বন্ধ করাসহ এতে সৃষ্ট দুর্গন্ধও দূর করতে সক্ষম। ১টি লেবুর রসের সাথে বেকিং সোডা মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এরপর সেটা ঘর্মাক্ত জায়াগায় লাগিয়ে ১০ মিনিট রাখুন। অথবা লেবুর রসের সাথে পানি মিশিয়ে নিন। একটি পরিষ্কার কাপড় সেই পানিতে  ভিজিয়ে সারা শরীর মুছুন। ২০ মিনিট পর গোসল করুন।

৫। টমেটোঃ টমেটোতে থাকা এস্টিনজেন্ট এবং কোষ ঠান্ডা রাখার উপাদান হাত পা ঘামা প্রতিকার করতে সাহায্য করে। এটা অতিরিক্ত ঘামার গ্রন্থিগুলোকে বন্ধ করে লোমকূপকে সঙ্কুচিত করে। এটা শরীরের তাপমাত্রাকেও কমিয়ে ফেলে। ১টি টমেটো কেটে ঘর্মাক্ত জায়গায় ঘষুন। অথবা টমেটো রস করে সেই জায়গাগুলোতে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রাখুন। এতপর কুসুমগরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দিনে একবার করে এটা করুন।

৬। ব্ল্যাক টি বা কালো চাঃ চায়ে এস্ট্রিনজেন্ট এবং আন্টিপারস্পিরান্ট আছে যা অতিরিক্ত তেল শুষে নিতে পারে। এটা হাত পা ঘামার প্রতিষেধক হিসেবে খুব কার্যকরী। ১ টি  ব্ল্যাক টি ব্যাগ ঘাম শুষে নিতে ৫ মিনিট হাতের তালুতে ধরে রাখুন। অথবা একটা ছড়ানো পাত্রে কাল চা বানিয়ে ঠান্ডা করে নিন। এরপর ৩০ মিনিট হাত পা ভিজিয়ে রাখুন। এটা দিনে দুইবার করতে পারেন। দিনে ২-৩ কাপ ব্ল্যাক টি খেতে ভুলবেন না।

৭। উচ্চ ম্যাগনেসিয়াম যুক্ত খাবারঃ

কাঠবাদাম খেলে হাত-পা ঘামা কমে যায়
কাঠবাদামে উচ্চ মাত্রায় ম্যাগনেসিয়াম আছে

হাত পা ঘামার অন্যতম একটি কারণ হল শরীর থেকে ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ কমে যাওয়া। ম্যাগনেসিয়াম লালাগ্রন্থি নিয়ন্ত্রণে এবং অতিরিক্ত ঘামা প্রতিকারে সাহায্য করে। তবে প্রথমে আপনার শরীরের ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ পরীক্ষা করে নিতে হবে। এটা যদি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয় তাহলে প্রচুর ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত খাবার খান। উচ্চ ম্যাগনেসিয়াম যুক্ত খাবারগুলো হল, কাঠবাদাম, এভকাডো, শিম, মিষ্টিকুমড়ার বিচি, গুড়, কাজুবাদাম, বাদাম, আলু, দই, সবুজ শাক, ইত্যাদি।

৮। কাঠকয়লাঃ শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পোড়ানো কাঠকয়লা হাত পায়ের ঘাম সমাধানে দারুণ কার্যকরী। এটা ত্বকে আদ্রতাভাব দূর করে। অনেক ত্বক যত্নের পণ্যতে এটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে  খালি পেটে একগ্লাস গরম পানর সাথে ১ চা চামচ কাঠকায়লার ছাই খেয়ে নিন। এতে যদি পেট ব্যাথা বা বমি হয় তাহলে খালি পেটে খাবেন না।

সতর্কতাঃ পেটে কোন ধরনের সমস্যা থাকলে এটা খাবেন না। কাঠকয়লার ছাই বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখুন।

৯। আলুঃ আলু অতিরিত ঘাম দূর করতে খুবই উপকারি সবজি। কয়েকটি আলুর টুকরো নিয়ে হাত পায়ের তালুতে ৫-৭ মিনিট ঘষতে থাকুন। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত পা ধুয়ে মুছে ফেলুন। এছাড়া আলুর রসও খেতে পারেন।

১০। গম গাছের সবুজ পাতাঃ গমের সবুজ পাতা শরীর থেকে জীবাণু ও ক্ষতিকর এসিড দূর করতে সাহায্য করে। এটা প্রাকৃতিক উপায়ে ব্যাকটেরিয়াকে তরল করে ফেলে। ফলে হাত পা ঘামার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। দিনে ৩-৪ গ্লাস এই রস পান করতে পারেন।

সতর্কতাঃ এটা পান করার ফলে অনেকের মাথা ব্যাথা হতে পারে।

বাড়তি পরামর্শঃ

ক. ঘর্মাক্ত হাত পা ঠাণ্ডা পানিতে ৩০-৪০ মিনিট ভিজিয়ে রাখলে কয়েক ঘণ্টার জন্য উপশম হয়।

খ. একটু পর পর হাত পায়ে ট্যালকম পাউডার মাখলে অতিরিক্ত হাত পা ঘামা কমে যায়।

গ. জীবাণু থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত গোসল করুন। মনে রাখবেন গোসলের সময় হাত পায়ের তালু ভাল করে ডলে ডলে পরিষ্কার করতে হবে।

ঘ. গোসলের পর ভাল করে পা মুছবেন। বিশেষকরে পায়ের গোড়ালি।

ঙ. প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি জুতা মোজা পড়বেন।

চ. প্রতিদিন মোজা পরিবর্তন করবেন।

ছ. বাইরে যাওয়ার সময় টিস্যু নিয়ে ভুলবেন না।

জ. গরম জায়গা এড়িয়ে চলবেন।

ঝ. পেট্রোলিয়াম জাতীয় লোশন এবং ত্বকের পণ্য ব্যবহার করবেন না।

ঞ. সব সময় শান্ত ও শিথিল থাকবেন। বেশি বেশি পানি খাবেন।

Recommended Posts

6 Comments

    • আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। যেকোন পরামর্শের জন্য মন্তব্য করুন।

  1. amar hat ghamar somossa ase vai, ami apnar poramorso gulo folow korar chesta korbo,
    sustho thakte amon lekha aro chai.

    • লেখাগুলো অনুসরণ করলে ভাল ফলাফল পাবেন ইনশাআল্লাহ্‌।

  2. শরীর অনেক বেশি ঘামে। এর জন্য কি করা যেতে পারে?
    সবসময় ঘামার কারনে একটু বেশিই কাশি হয়।

    • মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আপনি উপরের নিয়মগুলো অনুসরণ করে দেখুন। ইনশাল্লাহ কাজ হবে। অনুসরণ করার পর কেমন হয় জানাবেন।


Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *