জ্বর কমানোর প্রাকৃতিক চিকিৎসা

শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তাকে আমরা জ্বর বলি। ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট অথবা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে আমরা স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করি। কিন্তু এটা সর্বজন গ্রহণযোগ্য মত না। বয়সভেদে দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রার ভিন্নতা হয়।

জাতীয় স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট (NIH) এর মতে একজন শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ৯৯.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে সেটাকে জ্বর হলা হবে। আর একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ৯৯ থেকে ৯৯.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট অথবা ৩৭.২ থেকে ৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে সেটাকে জ্বর বলা হবে।

কখনো কখনো জ্বর অন্যকোন রোগের লক্ষণ হিসেবে হতে পারে। মানব দেহ যখন কোন সংক্রামণ (Infection)’র সাথে লড়াই করে তখন জ্বর হতে পারে। হঠাত এক পরিবেশ থেকে আরেক পরিবেশে যাওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের কারণেও জ্বর হয়।

সাধারণত কয়েকদিনের মধ্যে আপনা আপনি জ্বর ভাল হয়ে যায়। তবে জ্বরের কারণে যদি অস্বস্তি লাগে তাহলে আপনি সহজে ঘরে বানানো জ্বর কমানোর কিছু প্রাকৃতিক ঔষধ ব্যবহার করে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করতে পারেন।

সতর্কতাঃ শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

 

নিচে জ্বরের ঘরোয়া সমাধানগুলো বর্ণনা করা হল।



১। ঠান্ডা পানিঃ পরিষ্কার কাপড় ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে হাত-পায়ের তালু ও বগলের নিচে ভাল করে বার বার মুছে নিতে হবে। অথবা এক টুকরো কাপড় ভিজিয়ে কপাল এবং ঘাড়ে জলপট্টি দিলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। এছাড়াও কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করলে জ্বর ভাল হয়ে যায়। যদিও জ্বর হলে মোটেও গোসল করা উচিত নয়। যত বেশি সম্ভব বিশ্রাম নিতে হবে। অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

২। তুলসী পাতাঃ জ্বর কমানোর উপায় হিসেবে তুলসী পাতার ব্যবহার খুব কার্যকর। বাজারে পাওয়া জ্বরের এন্টিবায়োটিক ওষুধের মতই এটা কাজ করে।এতে থাকা নানা ঔষধি গুন দ্রুত জ্বর ভাল করতে পারে।

  • ২০ টি তুলসী পাতা এবং ১ চা চামচ আদা কুচি এক কাপ পানিতে গরম করতে থাকুন। পানি যখন অর্ধেক হয়ে যাবে তখন নামিয়ে ফেলুন। ১ চামচ মধু মিশিয়ে দিয়ে দুই থেকে তিনবার এই পানীয় পান করুন।

৩। আপেল সিডার ভিনেগারঃ জ্বরের প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে আপেল সিডার ভিনেগার দামি হলেও খুব কার্যকরী। এতে থাকা উপকারী এসিড ত্বকের  নিচ থেকে তাপ কমাতে দ্রুত কাজ করে।এতে উচ্চ মাত্রায় শরীরের জন্য উপকারী খনিজ পানীয় বা মিনারেল থাকায় জ্বর দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

  • আধাকাপ ভিনেগার গোসলের পানির সাথে মিশিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট সেই পানি সারা শরীরে ঢালুন। ২০ মিনিটের মধ্যে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাবে।
  • এক টুকরো কাপড় ৩ ভাজ করে এক ভাজ ভিনেগার দিয়ে আর বাকি দুই ভাগ পানি দিয়ে ভিজিয়ে কপাল এবং পেটে জলপট্টি দিন। পায়ের তালুতেও এই পট্টি দিতে পারেন। ভেজা কাপড় গরম হয়ে গেলে আবার পানি এবং ভিনেগার দিয়ে ভিজিয়ে নিন।
  • ২ চা চমচ আপেল সিডার ভিনেগারের সাথে ১ টেবিল চামচ মধু এক গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে দিনে ১বার পান করলেও ভাল ফল পাওয়া যায়।

৪। রসুনঃ রসুন শরীর গরম করে। আবার এই রসুন জ্বর কমানোর উপায় হিসেবে ভাল কাজ করে। রসুনে থাকা শরীর গরম করার নানা উপাদান দেহকে আরো উত্তপ্ত করে ঘাম ঝরানোর মাধ্যমে জ্বর সারাতে পারে। এটা শরীর থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও রসুনে আছে এন্টিফাঙ্গাল (Antifungal) এবং এন্টিব্যাকটেরিয়াল (Antibacterial) যা দেহের বিভিন্ন সংক্রামণের সাথে যুদ্ধ করতে সক্ষম।

  • বড় সাইজের এক কোয়া রসুন কুচি কুচি করে কেটে নিয়ে এক কাপ ফুটন্ত গরম পানির মধ্যে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এরপর রসুনের কুচিগুলো ছেঁকে ফেলে দিয়ে পানিটুকু চায়ের মত করে পান করুন। ভাল ফলাফলের জন্য এই পানি দিনে দুইবার পান করুন।
  • ২ কোয়া রসুন ছেঁচে, ২ টেবিল চামচ অলিভ অয়েলের সাথে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ দুই পায়ের তালুতে লাগিয়ে নিন। তবে পুরো তালু জুড়ে লাগানো যাবে না। মাঝে মাঝে ফাকা রাখতে হবে। গজ কাপড় দিয়ে পায়ের তালু পেঁচিয়ে সারারাত রাখুন। এই পদ্ধতিতে অনেকের এক রাতের মধ্যে জ্বর ভাল হয়ে যায়।

সতর্কতাঃ রসুনের এই চিকিৎসা গর্ভবতী ও বাচ্চাদের জন্য নয়।

৫। কিশমিশঃ কিশমিশে আছে নানা ধরনের এন্টিব্যাক্টেরিয়াল এবং এন্টিওক্সিডেন্ট খাদ্যগুণ। এছাড়াও জ্বর থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কিশমিশ টনিকের হিসেবে কাজ করে।

  • ২৫ টি কিশমিশ দেড় কাপ পানিতে নরম না হওয়া পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখুন। এরপর কিশমিশগুলো চটকে পানির সাথে ভাল করে মিশিয়ে নিন। ২ টেবিল চামচ লেবুর রস দিয়ে ভাল করে মিশ্রণ করুন। দিনে দুই বার এই মিশ্রণ সেবন করুন জ্বর না কমা পর্যন্ত।

৬। আদাঃ আদা দেহের তাপ কমাতে সাহায্য করে। এতে আছে প্রাকৃতিক এন্টিভাইরাল (Antiviral) যা দেহের ইমিউন সিস্টেমকে (Immune System) যে কোন ধরনের সংক্রামণ থেকে রক্ষা করে। ফলে দ্রুত অতিরিক্ত জ্বর কমানোর উপায় হিসেবে আদা অনেক কার্যকরী।

  • এক কাপ গরম পানির সাথে আধা চা চামচ আদা বাটা ভাল করে মিশিয়ে অল্প কিছুক্ষণ রাখুন। পরিমাণ মত মধু মিশিয়ে এই চা দিনে ৩ থেকে ৪ বার পান করুন।
  • এছাড়াও আধা চা চামচ আদার রসের সাথে ১ চা চামচ লেবুর রস এবং ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে দিনে ৩ থেক ৪ বার খেলে জ্বর কমে যায়।

৭। পুদিনা পাতাঃ জ্বরের প্রাকিতিক চিকিৎসা হিসেবে পুদিনা পাতা প্রসিদ্ধ। পুদিনা পাতা শরীরের ভেতরকে ঠান্ডা করতে পারে। এক কাপ গরম পানির সাথে এক টেবিল চামচ পুদিনা পাতা বাটা মিশিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। এরপর ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে দিনে ৩ থেকে ৪ বার পান করুন।

৮। চন্দনঃ চন্দনে থেরাপিউটিক ( Therapeutic) নামক ভেষজ উপাদান আছে, যা জ্বর কমানোর উপায় হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। চন্দন মূলত দেহ এবং মন দুটোকেই ঠান্ডা ও শান্ত রাখতে পারে।

  • আধা চা চামচ চন্দনের গুড়ার সাথে সামান্য পানি মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এই পেস্ট কপালে ভাল করে মাখিয়ে রাখুন। দ্রুত জ্বর কমাতে দিনে কয়েকবার এই পেস্ট ব্যবহার করুন।

অতিরিক্ত পরামর্শঃ

  • জ্বর হলে বেশি বেশি পানি এবং লেবু জাতীয় পানীয় পান করুন।
  • অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি অথবা বরফ ব্যবহার করবেন না।
  • ১ থেকে ২ দিন পুরোপুরি বিশ্রাম নিন।
  • প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাক সবজি খান।
  • ফ্রিজের খাবার এড়িয়ে চলুন।
  • ধূমপান থেকে বিরত থাকুন।

Notice: Function Elementor\Controls_Manager::add_control_to_stack was called incorrectly. Cannot redeclare control with same name "_skin". Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 1.0.0.) in /home/mxumgquj/sustho.com/wp-includes/functions.php on line 5831
আপনার পছন্দের লেখাগুলো নিয়মিত পেতে ইমেইল দিয়ে এখনি সাবস্ক্রাইব করুন।
সর্বশেষ পোস্টগুলো
Categories
ভাল লাগলে ৫ স্টার রেটিং দিন!

Recommended Posts

No comment yet, add your voice below!


Add a Comment

Your email address will not be published.